শিক্ষার্থীদের প্রতি মানবিক হতে হবেঃ ফাতিমা পারভীন

পৃথিবীর এই মহাক্রান্তিলগ্নে লক-ডাউনের আগের পৃথিবী আজ স্বপ্নের পৃথিবী হয়ে আছে। আবার আসবে সেই স্বপ্নের পৃথিবী হয়তো ফিরতে সময় লাগবে। তাই এখন থেকেই আমাদের বর্তমান পৃথিবীর সাথে নিজেকে মানিয়ে নিয়েই বসবাস করতে হবে,হয়তো এটাই হবে আমাদের বাসযোগ্য নতুন পৃথিবী। কেননা এই মুহূর্তে কেউই আমাদের পরিপূর্ণ স্বাস্থ্য সুরক্ষা সুবিধা নিশ্চিত করতে পারবে না। যতদূর সম্ভব নিজের প্রচেষ্টায় সর্বোচ্চ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার চেষ্টা করতে হবে। অন্তত ভেকসিন না পাওয়া পর্যন্ত করোনাকে সাথে নিয়েই আমাদের বেঁচে থাকতে হবে। করোনা আতংক নয় সচেতনতা বৃদ্ধি করে জয় করতে হবে।

আমাদের অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, কলেরা,ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মহামারীতে পরিণত হয়েছিল অসংখ্য মানুষ। চিকিৎসা ছিলনা। পারিবারিক সেবা থেকেও বঞ্চিত হতো আক্রান্ত রোগীরা। ওই মহামারী থেকে বাঁচতে মানুষের গ্রাম থেকে মাইগ্রেশনের কথা বলতে গেলে বড়সড় ফিরিস্তি হবে। তখনো মানুষ একসঙ্গে বাঁচার স্বপ্নে এভাবেই বিভোর ছিলেন। একসময় আবিষ্কার হলো ওইসব রোগ সংক্রমক রোগ,ছোঁয়াচে রোগ নয়। একসময় চিকিৎসা বের হলো। তখন কিন্তু একসঙ্গে পুরো পৃথিবী সংক্রমিত হয়নি। যা এখন হয়েছে। মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর শত্রু রুপে করোনাভাইরাস বর্তমানে সারাবিশ্বে ত্রাসের আঁধার হয়ে ইতিমধ্যে পাঁচ লক্ষেরও বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। আশার আলো হল,চিকিৎসা বিজ্ঞানের এতো আবিষ্কারের প্রতিযোগিতা আগে ছিলনা। ছিলনা সরকার তথা সামাজিক কোনো উদ্যোগ। জনসচেতনতা সৃষ্টির প্রচারণায় ছিলনা তেমন কোনো মাধ্যম।

এখন রাষ্ট্রের সাথে কিছু মহৎ মানুষের উদ্যোগ অসহায় মানুষদের পাশে থাকা সর্বোত্তম আচরনের বিস্ময়কর চিত্ররুপ মানবতাকে জাগ্রত করে। বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখায়। তাঁদের নিজেদের প্রিয় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করোনার সাথে ঝাঁপিয়ে পড়া প্রশিক্ষণহীন সাধারণ মানুষের মহৎ ও দুঃসাহসিক লড়াই অভিযান বিশ্বের দরবারে একটি দৃষ্টান্ত রাখবে। তাঁদের দেশ প্রেমের শানিত অস্ত্র নিয়ে তাঁরা যেভাবে নিজেদের নিয়োজিত করেছেন আর্তমানবতাকে কাজে লাগিয়ে করোনার যুদ্ধে, অসহায় ও মানসিক প্রতিবন্ধী এবং কুকুরদের খুঁজে খুঁজে খাবার, পোশাক বিতরণ, প্লাজমাদানসহ যে সকল জনপ্রতিনিধি,সরকারি কর্মকর্তা,ডা.-নার্স,আর পুলিশ সদস্যরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে সবাইকে সুরক্ষিত রাখতে নিঃস্বার্থভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন তা সত্যিকারে দেশ প্রেমের এক বাস্তব চিত্র ফুঁটে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

করোনাভাইরাস আতংকে পৃথিবী আজ থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, কত শতশত মানুষ আক্রান্ত হয়ে করুনভাবে কাতরাচ্ছে। কোভিড- ১৯ এর কাছে হেরে গিয়ে মৃত্যুবরণ করছে দেশের অসংখ্য মানুষ। আর কত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে দিনমজুর মানুষের জীবন, তাদের মধ্যে লুকিয়ে আছে করোনার চেয়েও ভয়াবহ ক্ষুধা। ওই ক্ষুধা সচেতনতা,মাস্ক, সামাজিক দূরত্ব জানেনা, কিংবা জানেনা স্বাস্থ্যবিধি। ওই শব্দগুলো ক্ষুধার কাছে হাস্যকর। নিয়তির নির্মমতার কাছে পরাজিত। তাই দারিদ্র্য ক্ষমা করছে না মহামারী, ছুটছেন যে যেভাবে পারেন কর্মস্থলে। অপরদিকে মনুষ্যত্ব ঘুমিয়ে আছে আত্মসাতের কাছে। করোনাভাইরাস নিয়ে সরকারের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। পাশাপাশি অধিকাংশ নেতাগুলো ব্যস্ত গরীবের চাল ও ত্রান চুরি নিয়ে, অর্ধ শতাধিকেরও বেশি জনপ্রতিনিধিদের বেহায়া আচরণ সুশীল সমাজের রাতের ঘুম হরণ করেছে। কি রকম আহাম্মক আর মূর্খ জনপ্রতিনিধি, পয়সার জন্যে যা ইচ্ছে তাই করতে পারে এদের কাছে ধর্ম, রাজনীতি, কৃষ্টি,সভ্যতা আর জনগণের ভবিষ্যৎ চিন্তার কোনো মানেই নেই।

অর্থের সীমিত গণ্ডির মধ্যেই তাদের আনাগোনা। তাদের আত্মার উপর অন্ধত্বের পট্টি বেঁধে বর্তমান, ভবিষ্যৎ এবং অতীতকে বিসর্জন দিয়ে লোভী কুকুরের মতো অর্থের বেদীতে আত্মাহুতি দিয়েছে তারা। তাদের আত্মার পরিশুদ্ধতা হয়তো আসবে না কোনোদিন। হতভাগা ওইসব জনপ্রতিনিধি জনগণের ভোট পেয়েও আবার সেই জনগণের ক্ষুধার্ত পেটের মধ্যস্থল থেকে আহার টেনে হিচড়ে বের করে খায়। তদন্তপূর্বক ওইসব অযোগ্য জনপ্রতিনিধিদের দোষী সাব্যস্ত করে দ্রুত দণ্ডের ব্যবস্থা নেয়া উচিত। কেননা তাদের ওইসব অপকর্মের জন্য অধিকাংশ সৎ আর মানবিক জনপ্রতিনিধিদের জনসেবা আজ ম্লান হতে চলেছে। ১৮ মার্চের পর শিশুসহ সকল শিক্ষার্থীরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত।

সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক অনলাইনে ক্লাস পরিচালিত হচ্ছে তাই দীর্ঘ বিরতির এই সময়ে অনলাইনে ক্লাস নেয়া নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ, কিন্তু আর্থ-সামাজিক বিষয়গুলো বিবেচনায় নেয়া উচিত। ক্লাসরুমে যে শিক্ষার্থী ব্র্যান্ডের শার্ট প্যান্ট পড়ে আসে তার পাশাপাশি যার একটা শার্টের একটা বোতাম থাকে না তার কথাও ভাবা উচিত। আমার ভাবনায় এই দুই ই সমান, দুজনেই সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করে। সবার সাধ থাকলেও সাধ্য থাকবে এমনটা নাও হতে পারে। যদি সবাইকে যথাযথ সুবিধার আওতায় নিয়ে এসে ক্লাস নেয়া যায়, তার থেকে ভাল আর কিইবা হতে পারে? যদিও এটি সুদূর পরাহত ব্যাপার, তবুও অতি মানবিক হতে গিয়ে যেন কারো প্রতি একটুও অমানবিক না হই। সবার কথা ভেবেই পরিশুদ্ধ মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটুক। অনতিবিলম্বে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি সব ধরনের মোবাইল ও টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানিগুলোর উচিত লেখাপড়ার স্বার্থে অন্তত দেশের ছাত্র ও শিক্ষকদের জন্য মোবাইল ও ইন্টারনেট ডাটায় বিশেষ ছাড় দেয়া।

নয়তো পিছিয়ে পড়বে শিক্ষা ব্যবস্থা। আসুন সবাই মিলে সচেতন হই মনে রাখবেন,রাষ্ট্রের কাছে আপনি একটি সংখ্যা মাত্র, কিন্তু পরিবারের কাছে আপনি পুরো পৃথিবী। বর্তমানে ক্রমবর্ধমান হারে আমাদের দেশে কোভিডে আক্রান্ত ও আশংকাজনকভাবে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হওয়া হাসপাতালে আইসিইউ বেড ও উচ্চ গতির অক্সিজেন সংকট বড়ই চিন্তার বিষয়। এই ভয়ংকর বাস্তবতার মধ্যে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হবার আগেই যতদুর সম্ভব ঘরে থাকা, মাস্ক পরিধান,জনসমাগম এড়িয়ে চলা, সাবান পানি দিয়ে বারবার হাত ধোয়ার মত প্রাক্টিসগুলো চালিয়ে যাবার কোন বিকল্প নেই।

ফাতিমা পারভীন

লেখক জনপ্রতিনিধি, শিশু ও নারী অধিকার কর্মী

fatimaparvin2013@gmail.com

মতামত দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে