পানিতে ডুবে মৃত: ২০জন কুড়িগ্রামে বন্যা ও নদী ভাঙনে বিপর্যস্ত হাজার হাজার মানুষ

পানিতে ডুবে মৃত
ফাইল ছবি

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধিঃ ২৩-০৭-২০২০

 কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপূত্র ও ধরলা নদীসহ অন্যান্য নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় টানা ২৫দিন ধরে দুর্ভোগে রয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষ। অপরদিকে তিস্তা নদীতে পানি কমে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে প্রচন্ড ভাঙন। একদিকে ভাঙন আর অন্যদিকে পানিবন্দী অবস্থায় চরম বিপর্যয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে এ অ লের মানুষ। এদিকে বন্যার ফলে পানিতে ডুবে মারা গেছে ২০জন।

 এরমধ্যে ১৫জন শিশু। বিষয়টি নিশ্চিত করেছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের সিভিল সার্জন ডা: হাবিবুর রহমান। মাঝখানে ২ থেকে ৩ দিন পানি কমে গেলেও গত এক সপ্তাহ ধরে কুড়িগ্রামে ধরলা ও ব্রহ্মপূত্র নদীর পানি আবারো হু-হু করে বাড়ছে।

বৃহস্পতিবার বিকেলে ধরলা নদীর পানি ৯২ সেন্টিমিটার বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অপরদিকে ব্রহ্মপূত্র নদের পানি চিলমারীতে ৬৯ ও নুনখাওয়া পয়েন্টে ৫৯ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। টানা বন্যায় জেলার ৯টি উপজেলার পাঁচ ভাগের তিনভাগ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে ৬০ ইউনিয়নের প্রায় ৫শতাধিক গ্রামের সাড়ে ৩ লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়েছে।

 এতে ৫০ হাজার বাড়িঘর বিনস্ট হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০ হাজার হেক্টর ফসলী জমির ক্ষেত। বন্যায় ৫টি স্কুল ভেঙে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরো ১৩৯টি। এছাড়াও ৩৭ কিলোমিটার সড়কপথ ও ৩১ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভাঙনে গৃহহীন হয়েছে প্রায় দেড় হাজার পরিবার। দীর্ঘ ২৫দিন ধরে ঘরবাড়ি ছাড়া পানিবন্দী মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে নিরব খাদ্যাভাব।

তিনবেলার জায়গায অনেকে দুবেলা খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। বানভাসীরাসহ জনপ্রতিনিধিরাও ত্রান সংকটের কারণে বিপাকে পরেছেন। এছাড়াও প্রত্যন্ত চরা লে লোকজন মানবেতর জীবন যাপন করছে। দেখা দিয়েছে শুকনো খাবার সংকটম স্যানিটেশন ও পানির প্রয়োজনীয়তা।

এছাড়াও জরুরী ঔষধের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। জেলার চিলমারী উপজেলার নয়ারহাট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবু হানিফা জানান, আমরা ত্রান সঠিকভাবে পাচ্ছি না, যেভাবে পাওয়া উচিৎ জনগণ সেভাবে পাচ্ছে না। এই মূহুর্তে শুকনো খাবার, স্যানিটেশন, পানি ও ঔষধের ভীষণ প্রয়োজন।

এই বন্যার মধ্যেই তিস্তা নদীতে পানি কমে যাওয়ায় জেলার রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙ্গা ও বিদ্যানন্দ এবং উলিপুর উপজেলার থেতরাই ও বজরা ইউনিয়নের কাসিমবাজারে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। তিস্তার পানির প্রবল ¯্রােতে রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের বুড়ির হাট এলাকায় ক্রস বারের মাটির ৫০ মিটার পানিতে ভেসে গেছে।

 ভাঙ্গন দেখা দিয়ে রাজারহাটের বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের রতিরাম এলাকার ক্রস বারেও। এতে করে ঐ দুই ইউনিয়নের প্রায় ২০টি গ্রাম ভাঙ্গনের হুমকীতে পড়েছে। গত ৫ দিন ধরে জিও ব্যাগ ও বালুর বস্তা ফেলে ভাঙ্গন ঠেকানোর চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ভাঙন কবলিত এলাকার আব্দুল আজিজ (৬২) জানান, তিস্তার ভাঙনে ৬ বার বাড়ি ভেঙেছি।

এবার আর জায়গা না থাকায় চর বিদ্যানন্দ থেকে পার্শ্ববর্তী গাবুর হেলানে জামাই নুর মোহাম্মদের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছি। এই এলাকার হক্কানী মিয়া জানান, এখানে গত ৮দিন ধরে ভাঙন চলছে। আজও ৫টি বাড়ি সড়িয়েছে। এরা হলো আব্দুল আজিজ, কাজী, রহমান, হবি ও নজরুল।

যেভাবে ভাঙছে তাতে হুমকীর মুখে রয়েছে গাবুর হেলান মসজিদ, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাজাপাড়া বালিকা বিদ্যালয়, সোলাবাড়ি সারকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তৈয়ব খাঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মহাসানিয়া দাখিল মাদ্রাসা, রাঘব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ মসজিদ, মন্দির, ঈদগাহ মাঠ ও কবরস্থান। যা বিলিনের পথে রয়েছে।

এদিকে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কন্ট্রোল রুমের এক তথ্যে জানা যায়, গত ২০জুন থেকে ২২জুলাই পর্যন্ত বন্যার পানিতে ডুবে ২০জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১৫জন শিশু। যার মধ্যে ৬জন কন্যা শিশু ও ৮জন ছেলে শিশু। শিশুরা হলেন-আরাফাত আলী (৭), শান্ত মিয়া (১০), বেলাল হোসেন (৫), মুক্তাসিন (১৪ মাস), কথা রায় (২), জাহিদ (১২),সুচরিতা (২), মাহিন (১৭মাস), লামিয়া খাতুন (২),

কেয়া আক্তার মীম (১০), রাকু (১৫), মুন্নি (১৮মাস), লাদেন (৭), বায়েজিদ (৮) ও ইয়াছিন আলী (৮)। মৃত অন্যরা হলেন-জামাল ব্যাপারী (৫৫), সৈয়দ আলী (৭০), আব্দুল আবুয়াল (৪০), নুরুল আমিন (৭০) ও সুরুজ্জামান (৪৩)। সিভিল সার্জন ডা: হাবিবুর রহমান শুধু পানিতে ডুবে ১৫জন শিশুর মৃত্যুতে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

 তিনি দাবি করেন শুধুমাত্র জনসচেতনতার মাধ্যমে এ মৃত্যুর মিছিল থামানো সম্ভব। এ জন্য স্বাস্থ্য বিভাগ জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে নানা কর্মসুচি হাতে নিয়েছে। সকল চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য কর্মীদের এ ব্যাপারে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম জানান, আমরা প্রথম ও দ্বিতীয় দফা বন্যায় ৪৫লক্ষ ৫০হাজার টাকা বিতরণ করেছি। ২ লক্ষ টাকার শিশু খাদ্য ও ২ লক্ষ টাকার গো-খাদ্য। এছাড়াও ৫ হাজার শুকনো খাবারের প্যাকেট বিতরণ করেছি।

মতামত দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে