কোরবানির গোস্তো লাইনে দাড়িঁয়ে নয় বাসায় পৌঁছে দিন।


মোঃ নাজমুল হাসান : আগামী ১ আগষ্ট দেশে কুরবানীর ঈদ। কুরবানী আদায় করার মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করা। গোশত খাওয়া উদ্দেশ্য না হলেও কুরবানীর ঈদ মানে খাবারের একটি বিশাল আয়োজন। যারা কুরবানী দিয়ে থাকেন তাদের সবার বাড়িতেই রান্না করা গোশতের খুশবো ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় নানানরকম আয়োজন।
কিন্তু যারা কুরবানী দিতে অক্ষম বা যাদের উপর কুরবানী দেয়া ওয়াজিব নয় আমরা কি তাদের খবর ঠিকমতো রাখতে পারি?? তারা কি অবস্থায় রয়েছে তা কি খেয়াল করি??? আমাদের পাড়া প্রতিবেশি অনেকেই আছে যাদের অর্থনৈতিক অবস্থা দুর্বল। কুরবানী আদায় করার মতো সক্ষমতা অনেকেরই নেই। আমাদের চারপাশে এমন পরিবারও রয়েছে যারা দিন আনে-দিন খায়।

করোনাভাইরাস মহামারিতে খেটে খাওয়া মানুষগুলোর আয়-রোজগার বন্ধ। তাই দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়ে গেছে বহুগুনে। কারন সেই মার্চ মাস থেকে অনেকেই কর্মস্থল ত্যাগ করে গৃহবন্দী হয়ে আছে। ঘরের একমাত্র উপার্জনকারী হলেও তাদের বাধ্য হয়ে বাড়ি থাকতে হচ্ছে জীবন মরণের কথা ভেবে।
প্রতিবছর কুরবানীর ঈদ এলে নতুন ফ্রিজ ক্রয় করা ও ঘরের ফ্রিজটি মেরামত করার হিড়িক পড়ে যায়। এ বছর অবশ্য তেমনটা এখনো চোখে পড়ছে না। এর অন্যতম কারন হতে পারে অনেকেরই আয়-রোজগার বন্ধ বা আয়-রোজগার খুব কম। তবুও আমাদের সমাজে অর্থ জমিয়ে রাখা বিত্তবান মানুষের সংখ্যা নেহাৎ কম নয়। এ সমাজে যাদের আছে তাদের প্রচুর অর্থকড়ি রয়েছে। আবার যাদের নাই তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
আসছে কুরবানীর ঈদেও যাদের উপর কুরবানী আদায় করা ওয়াজিব তারা আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে কুরবানী আদায় করবো। অনেকেই সমবন্টণ করে বিলিয়ে দিবে । আবার অনেকে গোশত ফ্রিজে জমিয়ে রাখবে। বছর শেষে তা নষ্ট হয়ে যাবে হয়তো, তখন রাস্তায় ডাস্টবিনে ফেলে দেয়া বা কুকুরকে খাওয়াতে দেয়া ছাড়া উপায় থাকে না। কিন্তু এমনটা যেনো না হয়। জমিয়ে রেখে নষ্ট হওয়ার পর ডাস্টবিনে বা কুকুর-বিড়ালকে না দিয়ে যারা সারা বছর অভূক্ত থাকে তাদের মাঝে বিলিয়ে দেয়াই উত্তম।
কুরবানীর গোশতের নিয়ম হলো নিজ ভাগের পুরা গোশত কে তিন ভাগে ভাগ করে তার এক ভাগ গরিব-মিসকিনদের মাঝে বিলিয়ে দেয়া। এ ক্ষেত্রে যাদের উপর কুরবানী ওয়াজিব নয় এমন পাড়া প্রতিবেশিদের ঘরে ঘরে কুরবানীর গোশত পৌছে দেয়া। এছাড়াও তিন ভাগের এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনদের জন্য রাখার বিধান রয়েছে।
কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যায়, নাম মাত্র কিছু গোশত বিলিয়ে দিয়ে আত্মীয় স্বজনের দোহাই দিয়ে সারা বছর খাওয়ার আশায় গোশত ফ্রিজ করে জমিয়ে রাখে অনেকে। যা মোটেও ঠিক কাজ নয়। এতে করে কুরবানী আল্লাহর উদ্দেশ্যে না হয়ে মাংস খাওয়াই উদ্দেশ্য হয় বলে মনেহয়।
হ্যাঁ নিজেদের জন্য রাখা ভাগের সামান্য কিছু সংরক্ষণ করা যেতে পারে। কারন আমাদের আপনজন কেউ কেউ দূরে অবস্থান করছেন বা নিজেরা পরবর্তীতে খাওয়া যেতে পারে। তবে আমার মনে হয় কুরবানীর গোশত জমিয়ে না রাখাই ভালো। কারন যে কুরবানী আদায় করতে পারতেছি, পরবর্তীতে তাদের ক্রয় করে খাওয়ারও সামর্থ্য রয়েছে ।
আপনার ঘরের রান্না করা গোশতের খুশবো ঘ্রাণ ছড়িয়ে যায় বাতাসের সাথে। পাশের বাড়ির বা প্রতিবেশি যারা কুরবানী আদায় করতে পারেনি তাদের ঘরে অবুঝ শিশুরা রয়েছে। এমনও পরিবার রয়েছে যারা বছরে একবার গোশত খেতে পারে এই কুরবানির উসিলায়। অবুঝ শিশুরা তাদের বাবা-মায়ের কাছে গোশত খাওয়ার আকুতি জানায়। ছোট ছোট বাচ্চারা তো মনে করে সমাজের সবাই সমান। ঐ ঘরে গোশত রান্না হলে কেনো তাদের ঘরে রান্না হবে না। তাই তাদের বাবা-মায়ের কাছে আবদার থাকে। আর বাবা-মাকে সে আবদার পূরণ করতে হয় বাধ্য হয়ে। বাবা-মায়ের মন তখন সন্তানের ইচ্ছা পূরণে ব্যকুল হয়ে ওঠে।অনিচ্ছাসত্ত্বেও অন্যের দুয়ারে হাত পাততে হয়। একান্ত ইচ্ছা পূরণ করতে না পারলে মন খারাপ করা বা আল্লাহর দরবারে কান্না করা ছাড়া তাদের হয়তো আর কোনো উপায় থাকে না।

ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলাম মানবতার ধর্ম। ইসলাম ধনী -গরিব সবার জন্য সমান অধিকার দিয়েছেন। যাকাত ব্যবস্থার মাধ্যমে ধনীর সম্পদে গরিবের হকের বিধান রয়েছে। কেউ খাবে আর কেউ উপোস থাকবে ইসলামে এমনটা বলা হয়নি। আপনি নিজের জন্য যা পছন্দ করবেন, অন্যের জন্যও তা পছন্দ করুন এটাই হলো ইসলামের নৈতিক শিক্ষা।
কুরবানী একটি ইসলামিক আদেশ। তাই কুরবানী যারা দিবো তারা ইসলামিক হুকুম পরিপূর্ণ মানার চেষ্টা করি। তাহলে সমাজে আর কেউ না খেয়ে বঞ্চিত থাকবে না। ফ্রিজে গোশত না পচিয়ে গরিবের মাঝে বিলিয়ে দেই, তাতে হক আদায় হবে এবং সওয়াবও বেশি পাওয়া যাবে।
আমাদের দেশের উপরতলায় বসবাস করা মানুষ লোকের মুখে নিজেকে ‘সম্পদশালী বা দানবীর’ প্রকাশের জন্য প্রতিযোগিতা করে দাম হাকিয়ে বাজারের সেরা গরুটা ক্রয় করে। যাতে সমাজের মানুষ বলে অমুক এ বছর সেরা গরুটা দিয়ে কুরবানী করছে বা অমুক দশটা/বিশটা গরু দিয়ে কুরবানী করছে। অথচ ইসলামের বিধান হলো, আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্ঠি অর্জনের লক্ষ্যে যার যেমন তৌফিক সে তেমন ভাবে কুরবানি আদায় করবে। এখানে প্রতিযোগিতা বা নিজেকে জাহির করার কিছু নেই।
যারা প্রতিযোগিতা করে তারাই আবার গরু জবাই করার পর লাইনে দাঁড় করিয়ে গোশত বিলিয়ে দেয়। বাস্তবতায় দেখা যায়, নিম্ন মধ্যবিত্তরা বা গরিব-মিসকিনরা অনেকে লজ্জা ও ইজ্জত রক্ষায় লাইনে দাড়িয়ে গোশত সংগ্রহ করতে যায় না। লাইনে দাড় করিয়ে নয় বরং (সম্ভব হলে) অভাবী গরিব-মিসকিনদের ঘরে ঘরে কুরবানীর গোশত পোঁছে দেয়া আমাদের কর্তব্য। আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে উত্তম বিনিময় পাওয়ার আশায় আমরা এটা করতে পারি।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সমস্ত নেক আ’মল গুলো কবুল করুন। আমাদের ভুল-ত্রুটিগুলো যেন মাফ করে দেন- আমিন।###

মোঃ নাজমুল হাসান
বি.এস.এস (সম্মান), এম.এস.এস
যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

মতামত দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে