কুরবানী হোক প্রত্যেকের আত্মত্যাগ।

লেখক : হাফেজ নুরুজ্জামান আলমাসী।

কোরবানি ইসলামের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও ত্যাগের স্মারক। কোরবানি আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ হলো ত্যাগ, উৎসর্গ ও নিকটবর্তী হওয়া ইত্যাদি। পরিভাষায় আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের আশায় নির্দিষ্ট সময়ে বিশেষ পশুকে জবাই করার নামই কোরবানি। মহান আল্লাহ তার নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাগণকে বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করে থাকেন। এ ধরনের বান্দারা যে কোন কঠিনতর পরীক্ষায় অনায়াসে সফলতা লাভ করেন। যা পরবর্তীতে কালের পর কালের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকে। আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে এ ধরনের এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন জলিলুল কদর পয়গম্বর হযরত ইবরাহিম (আ.)। এর পূর্বে তার থেকে যতগুলো পরীক্ষা নেয়া হয়েছিল সকল পরীক্ষায় তিনি সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। আর এবারের পরীক্ষাটা হলো অগ্নি পরীক্ষা। দীর্ঘ ৮৬ বছর বয়স পর্যন্ত নিঃসন্তান ছিলেন হযরত ইবরাহিম (আ.)। সন্তানের জন্য আল্লাহার কাছে তিনি দোয়াও করেন। আল্লাহতায়ালা তার ভাষাটা কোরআন শরিফে বলেন,
‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে এক সৎ পুত্র দান কর। এরপর আমি তাকে এক সহনশীল পুত্রের সুসংবাদ দান করলাম’।
(সূরা সাফফাত, ১০০-১০১)

মহান আল্লাহ তায়ালা সুরা হজ্জে ইরশাদ করেন : ‘আমি প্রত্যেক উম্মাতের জন্য কুরবানির বিধান রেখেছি।’ (সুরা হজ্জ : আয়াত ৩৪)

সূরা কাওছারে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশে সালাত আদায় করো এবং কোরবানি করো।’ (সূরা কাওসার, আয়াত-২)

কোরবানীর উদ্দেশ্য
কোরবানির হলো আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম। আদি পিতা আদম (আ.) এর যুগ থেকেই কোরবানির বিধান চালু হয়েছিল। আদম (আ.) এর দুই ছেলে হাবীল ও কাবীল দু’জনেই কোরবানি দিয়েছিলেন। তাদের একজনের কোরবানি আল্লাহর কাছে কবুল হয়েছে এবং অন্যজনের কোরবানি কবুল হয়নি। পৃথিবীতে কোরবানির ইতিহাস এখান থেকেই শুরু।

কোরআনে এসেছে- আদম (আ.) দু’পুত্রের একজনের কোরবানি কবুল হওয়ার পর কাবিল (যার কোরবানি কবুল হয়নি) বলল, আমি তোমাকে অবশ্যই হত্যা করব। অপরজন হাবিল (যার কোরবানি কবুল হয়) বলল, অবশ্যই আল্লাহ মুত্তাকিদের কুরবানি কবুল করেন। যদি তুমি আমাকে হত্যা করতে আমার দিকে হাত প্রসারিত কর, তবুও আমি তোমাকে হত্যা করতে তোমার প্রতি হাত প্রসারিত করব না। কেননা আমি বিশ্বজগতের প্রতিপালককে ভয় করি।’
(সুরা মায়েদা : আয়াত ২৭-২৮)

এ আয়াত দ্বারা বোঝানো হয়েছে কুরবানি কবুল হওয়া ব্যক্তির সহীহ নিয়ত থাকা প্রয়োজন। কেননা কোরবানি তাকওয়াবান লোকদের আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অনন্য নিদর্শন।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন: ‘আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্যে কোরবানিকে ইবাদতের অংশ করেছি। যাতে জীবন উপকরণ হিসেবে যে গবাদি পশু তাদেরকে দেয়া হয়েছে, তা জবাই করার সময় তারা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে আর সব সময় যেন মনে রাখে একমাত্র আল্লাহই তাদের উপাস্য। অতএব তাঁর কাছেই পুরোপুরি মাথানত করা। আর সুসংবাদ দাও সমর্পিত বিনয়াবনতদের, আল্লাহর নাম নেয়া হলেই যাদের অন্তর কেঁপে ওঠে, যারা বিপদে ধৈর্যধারণ করে, নামাজ কায়েম করে আর আমার প্রদত্ত জীবন উপকরণ থেকে দান করে।’ (সূরা হজ, আয়াত ৩৪-৩৫)

এ আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, মুসলিমদের জন্য কোরবানিকে ইবাদতের একটি অংশ করা হয়েছে। আর জীবনোপকরণ হিসেবে যে গবাদি পশু দেওয়া হয়েছে তা বিসর্জন দিয়ে আল্লাহর কাছে সন্তুষ্টি চিত্তে সমর্পিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

আজকের মুসলিম সমাজে যে কোরবানির প্রচলন রয়েছে তা মূলত জাতির পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর দেখানো পথ থেকেই। হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর শতবর্ষ বয়সের পর আল্লাহ তায়ালা তাঁকে যে সন্তান দান করেছিলেন, সেই কলিজার টুকরা হযরত ইসমাইল (আ.)কে আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে কোরবানির সূত্র ধরে আজও সেই কোরবানি প্রচলিত আছে।

‘তখন হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম পুত্র ইসমাইলকে বললেন, ‘হে ছেলে! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, তোমাকে জবেহ করছি। এ বিষয়ে তোমার অভিমত কি? সে (হজরত ইসমাইল আলাইহিস সালাম) বলল, ‘পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, আপনি তা পালন করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন।’ (সুরা সাফফাত : আয়াত ১০২)

এর পরেই আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মনে রেখো, এ ছিল এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তাকে সুযোগ দিলাম এক মহান কোরবানির। পুরো বিষয়টি স্মরণীয় করে রাখলাম প্রজন্মের পর প্রজন্মে। ইব্রাহিমের প্রতি সালাম। এভাবেই আমি সৎকর্র্মশীলদের পুরস্কৃত করি।’ (সূরা সাফফাত, আয়াত ১০৬-১১০)

আল্লাহ তায়ালা ইবরাহীম (আ.) এর পরীক্ষা নিয়েছেন ছেলেকে কোরবানীর আদেশ দিয়ে। যখন সেই পরীক্ষায় তিনি সফল হলেন, তখন আল্লাহ তায়ালা সন্তুষ্ট হয়ে ইসমাইলের পরিবর্তে অন্য পশু জবেহ করে পুরস্কৃত করলেন ইবরাহীম (আ.) কে। আর এইভাবেই প্রতিটি সৎ কর্মীশীলদের পুরস্কৃত করে থাকেন মহান আল্লাহ।

আল্লাহ পাক তাঁর বান্দাদের কোরবানীর আদেশ দিয়ে দেখেন, তিনি যা দিয়েছেন তা ত্যাগ স্বীকারে তার বান্দারা রাজি কি না? আবার কী নিয়তে তাঁর বান্দারা উৎসর্গ করছে তাও তিনি পর্যবেক্ষণ করেন।
রাসূলে আকরাম (সঃ) এরশাদ করেছেন, কুরবানীর দিনে মানব সন্তানের কোন নেক আমলই আল্লাহ তায়া’লার কাছে এত প্রিশ না, যত প্রিয় কুরবানী করা। আর কুরবানির পশুর শিং,পশম ও ক্ষুর কিয়ামতের দিন মানুষের আমলনামায় যুক্ত হবে। কুরবানির পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগে তা আল্লাহর দরবারে পৌছে যায়। সুতরাং তোমরা আনন্দ চিত্তে কুরবানী করো। (তিরমিজি)

কোরবানির দিনের করণীয়ঃ

★ঈদের সালাত আদায় করা,
★ এর জন্য সুগন্ধি ব্যবহার,
★পরিচ্ছন্নতা অর্জন,
★সুন্দর পোশাক পরিধান করা।
★তাকবীর পাঠ করা।
★কোরবানির পশু জবেহ করা ও তার গোশত আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব ও দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করা।
★এ সকল কাজের মাধ্যমে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নৈকট্য অর্জন ও সন্তুষ্টি অন্বেষণের চেষ্টা করা।
★এ দিনটাকে শুধু খেলা-ধুলা, বিনোদন ও পাপাচারের দিনে পরিণত করা কোন ভাবেই ঠিক নয়।

অতএব, লোক দেখানো কোরবানি নয়, মুসলিম উম্মাহর কোরবানি হওয়া উচিত পশুকে জবাইয়ের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে মনের পশু ও আমিত্বকে জবাই করা। আবার নিজেকে তাকওয়াবান হিসেবে গড়ে তোলার অন্যতম মাধ্যমও হলো কুরবানি।

মতামত দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে