ব্যাপক উন্নয়ন আর কট্টর পরিশ্রমে পাল্টে গেছে দাসিয়ারছড়ার মানুষের জীবন।

বিলুপ্ত ছিটমহল বিনিময়ের ৬ষ্ঠ বর্ষে, দাসিয়ারছড়াবাসীর দাবী স্বতন্ত্র ইউনিয়ন চাই ?
বর্তমান সরকারের বিগত কয়েক বছরের বিলুপ্ত ছিটমহলের ব্যাপক উন্নয়ন আর কট্টর পরিশ্রমে পাল্টে গেছে দাসিয়ারছড়ার মানুষের জীবন। ছিটমহল এখন শুধুই ইতিহাস ও অতীত স্মৃতি।
৬ষ্ঠ বর্ষে পর্দাপনে চিটমহলে নানা অনুষ্ঠানঃ মুজিব বর্ষ উপলক্ষে দেশের বৃহত্তম বিলুপ্ত ছিটমহল বিনিময়ের বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানটি ব্যাপক হারে করার কথা থাকলেও মরণঘাতী করোনা ভাইরাসের কারণে কাঁটছাঁট করা হয়েছে। ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই এই দিনে বাংলাদেশ-ভারত মুজিব-ইন্দিরা সীমান্ত চুক্তি’র বাস্তাবায়ন ঘটে। দীর্ঘ ৬৮ বছরের বঞ্চনার পর ১৬২টি ছিটমহল একীভূত হলে তার নাগরিকরা পছন্দমত দেশের নাগরিক হতে পেরে মহাখুশি। ৬ষ্ঠ বর্ষে পদার্পন উপলক্ষে কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়ার নাগরিকরা স্বল্প পরিসরে আয়োজন করেছে। এরমধ্যে শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টায় অনুষ্ঠিত হবে সংক্ষিপ্ত আলোচনাসভা । এরপর রাত ১২টা ১ মিনিটে ৬৮টি মোমবাতী প্রজ্জ্বলন শেষে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পন করা হবে। এছাড়াও রাতে দাসিয়ারছড়ার প্রতিটি বাড়িতে আলোকসজ্জ্বাসহ শনিবার আয়োজন করা হয়েছে হা-ডু-ডু খেলা। পাশাপাশি মসজিদে মসজিদে মিলাদ মাহফিল ও মন্দিরে বিশেষ প্রার্থনা করা হবে। ছিটমহল বিনিময়ের ৫ বছর পূর্তিতে প্রত্যাশার চেয়ে বেশী প্রাপ্তি থাকায় মহাখুশিতেই বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দারা।

ফুলবাড়ী উপজেলা প্রশাসন সুত্রে জানা গেছে, গত ৫ বছরে প্রায় ২২ কোটি টাকার বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনা করা হয় দাসিয়ারছড়া উন্নয়নে। এর মধ্যে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন, ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে এলজিইডির মাধ্যমে ২৪ কিলোমিটার পাকা রাস্তা, ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে কমিউনিটি রির্সোস সেন্টার, ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৫টি মসজিদ, ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি মন্দির, ২ কোটি ১৯ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি ব্রিজ, ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০টি হত দরিদ্র পরিবারের বসতবাড়ী নির্মাণ, ২২ কিলোমিটার পাকা সড়ক, দুঃস্থ পরিবারে স্যানিটারী ল্যাট্রিন স্থাপন, দুঃস্থ পরিবারে নলকুপ স্থাপন, একটি করে শ্মশান ঘাট, শহীদ মিনার, নীলকমল নদীতে ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে সেতু নির্মান, ১৫ মিটার দৈর্ঘের ৪ টি ব্রীজ/কালর্ভাট নির্মান, ৩টি প্রাথমিক বিদ্যাল ভবন নির্মান, ৭৮২ জন বয়স্ক ভাতা, ৩৩৯ জন বিধবা ভাতা, ৫১৫ জন প্রতিবন্ধী ভাতা, বিশুদ্ধ পানীয় সরবরাহের জন্য ৪৫ টি নলকুপ স্থাপন ১ হাজার ৮৫৯ জনকে ভিজিডি কার্ড, মাতৃত্বকালিন ভাতা ২০০ জনকে, সেলাই মেশিন ৫৫ জনকে, একটি বাড়ী একটি খামার প্রকল্পে ৩৬০ জনকে মোট ২৪ লাখ ২৩ হাজার টাকার ঋণ প্রদান, ৫০০ হতদরিদ্র পরিবারকে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা, ১টি নি¤œমাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, ২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ,১টি কলেজের একাডেমিক স্বীকৃতি । এছাড়াও ১টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ১ টি দাখিল মাদ্রাসা নাম শেখ ফজিলাতুন্নেছা দাখিল মাদ্রসা সাম্প্রতি সময়ে সরকার জাতীয় করণ ঘোষনা করেছেন। সেই সঙ্গে দীর্ঘ ৬৮ বছর পিছিয়ে থাকা বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীদের আইসিটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের জন্য ৮৬ লক্ষ টাকা ব্যয়ে দ্বিতল ডিজিটাল সার্ভিস ইমপ্লয়েন্টমেন্ট এন্ড ট্রেনিং সেন্টার মুজিব বর্ষে উপহার দেয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ভূমি জটিলতার বিষয়টি সম্পুর্ণভাবে নিরসন হয়ে গেছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন ১ হাজার ৬৪৩ দশমিক ৪৪ একর ও সরকারি খাস খতিয়ান ভুক্ত ৯ একর জমির প্রাক জরিপ শেষ করে খতিয়ান হস্তান্তর করা হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত কল্পে স্বাস্থ্য বিভাগ কর্তৃক ৩টি কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ করা হয়েছে। দাসিয়ারছড়াসহ বিলুপ্ত ছিটমহলে বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তির ৭৫ দিনের মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৫৬২ পরিবারে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়েছে। এখন আর কোন বাড়িই নেই বিদ্যুৎ বিহীন জীবন। দেয়া হয়েছে দ্রæত গতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ। ডিজিটাল সাব সেন্টার থেকে স্বল্পমূল্যে দেয়া হচ্ছে তথ্য প্রযুক্তির সেবা। ইউনিসেফের অর্থায়নে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি স্থাপন করেছে ১৫ টি প্রাক প্রাথমিক শিক্ষা কেন্দ্র। এছাড়া ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছে ১৪ টি মসজিদ ভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কেন্দ্র। উপজেলা কৃষি অফিসার অর্থায়নে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও কৃষি যন্ত্রপাতি দেয়া হয়েছে। দাসিয়ারছড়ায় ঘরে ঘরে সুপেয় পানি আর স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়েছে। আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর বেকার যুব ও যুব মহিলাদের দেয়া হয়েছে নানা ট্রেডে প্রশিক্ষণ। । ২ হাজার ১৬০ জন নারী-পুরুষকে স্বাক্ষরতার আওয়াতায় আনা হয়েছে এবং উন্নয়নের কাজ চলতে থাকবে।’

বিলুপ্ত দাসিয়ারছড়া ছিটমহলের অধিবাসী মোজাফ্ফর হোসেন,নুর আলম ,মনিরুজ্জামান ও তানিয়া বেগম জানান, চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ৬৮ বছওে আমাদের অবরুদ্ধ জীবনের অবসান ঘটেছে। মূল ভূ-খন্ডে যুক্ত হওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যে বর্তমান সরকার ঘরে ঘরে বিদ্যুত, রাস্তা ঘাট,ব্রীজ কালভাট,স্কুল-কলেজ,মাদ্রাসা ,কমিউনিটি ক্লিনিকসহ দাসিয়ারছড়ায় ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকান্ডের বিল্পব ঘটেছে। আমরা কখনো কল্পনায় করিনি সরকার এতো দ্রæত দাসিয়ারছড়ায় উন্নয়ন করবে। সরকারের কাছে দাসিয়ারছড়াবাসী চির ঋনী । যতদিন বেঁচে থাকবো ততদিন এই সরকারের জন্য দোয়া কামনা করেই যাবে। বর্তমানে প্রতিটি পরিবারের ছেলে-মেয়েরা নিজ জন্মভুমিতেই স্কুল-কলেজে লেখাপড়ার পাশাপাশি দেশের বড় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। অনেকেই বিভিন্ন সরকারি-বে-সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করে পরিবারের স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনছে। এখন বাংলাদেশি নাগরিক হিসাবে সকল ধরণের সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছি। তারা আরও জানান শেখ হাসিনা সরকার নাই চাইতে দাসিয়ারছড়াবাসীকে অনেক কিছুই দিয়েছে। তাই সরকারের কাছে আমরা চিরকৃতজ্ঞ। সরকারের কাছে দাসিয়ারছড়াবাসীর শেষ দাবী তিনি যেন এই দাসিয়ারছড়াকে একটি স্বতত্র ইউনিয়ন ঘোষনা করে।

শিক্ষার্থী সোহেল রানা ও জেসমিন আক্তার জুঁই জানান, পাঁচ থেকে ছয় বছর আগে আমরাসহ অনেকেই মিথ্যা ঠিকানা দিয়ে ভয় ভয় করে পড়াশুন।

মতামত দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে