নান্দাইলে ঝুলন্ত  মরদেহ উদ্ধার এর ঘটনায় স্বারক লিপি প্রদান।

নিজস্ব প্রতিবেদক,নান্দাইল।

নান্দাইল উপজেলার জাহাঙ্গীরপুর ইউনিয়নের বাতুয়াদি গ্রামের দুই সন্তানের জননী সাবিনা ইয়াসমিনকে অব্যাহত নির্যাতন ও সবশেষে ঝুলন্ত অবস্থায় লাশ পাওয়ার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং অপরাধীদের গ্রেফতার ও বিচারের ক্ষেত্রে পুলিশ প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতা প্রত্যাশা করে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বরাবর স্মারকলিপি প্রদান।

বরাবর,
ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, নান্দাইল থানা
ময়মনসিংহ , ঢাকা।

শুভ সকাল, যদিও শুভ বলার মতো পরিস্থিতি আমাদের নেই। আজ করোনাকালীন ভয়াবহ সময়ের মাঝে দাঁড়িয়েও সামাজিক দূরত্বের কথা না ভেবে আমাদের ভাবতে হচ্ছে মা বোনের নিরাপত্তার কথা। এমন এক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি যেখানে সর্বত্র নারী নিপীড়ন, ধর্ষণ ও হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটছে। অনেকক্ষেত্রে অপরাধীরা সাজা পেলেও বেশিরভাগ জায়গাতেই অপরাধীরা পাড় পেয়ে যাচ্ছে। এখানে বিচারবিভাগ এবং ভিক্টিমের মাঝে সংশ্লিষ্ট থানার একটা ভূমিকা থাকে। যেসব ক্ষেত্রে থানার ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয় সেখানেই ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্থ হয়। এবার আসবো একটু বিস্তারিত ঘটনায়।

যৌন নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীজোট এর পক্ষ থেকে আমরা সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হয়ে আজ আপনাদের থানাতে এসেছি আমাদের কিছু পর্যবেক্ষণ নিয়ে। আমরা আশা রাখছি এই পর্যবেক্ষণের ওপর আপনারা কিছুটা হলেও আলোকপাত করবেন।

ঘটনাটি ২৯ জুলাই ২০২০ রোজ বুধবার এর। নান্দাইল থানার রাজগাতী ইউনিয়নের মেয়ে সাবিনা ইয়াসমিনের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয় একই উপজেলার জাহাঙ্গীরপুর ইউনিয়নের বাতুয়াদি গ্রামে সাবিনার স্বামীর গৃহ থেকে। এটিকে আত্মহত্যা বলে চালানো হলেও সাবিনার ওপর তার স্বামী খায়রুল ও মামলায় উল্লেখিত ভাসুর ঝা সহ সকলের অমানবিক নির্যাতন ছিলো পূর্ব থেকেই। সাবিনাকে এর আগেও অকথ্য নির্যাতন চালায় তার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকেরা৷ গত একবছর আগে মামলাও হয়( মামলার কাগজ সংযুক্তি ফাইলে আছে)৷  কিন্তু আমাদের গ্রামীন সমাজ ব্যবস্থায় যা হয় এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। মামলা মীমাংসার দিকে গড়িয়েছে। তারপর আবারো সেই একই নির্যাতন। সাবিনা গত ২৯ জুলাই বুধবার সকাল ১০টার দিকে তার মায়ের নাম্বারে ফোন দেয়৷ মাকে সে জানায় তাকে মেরে ফেলবে এরা, পরিকল্পনা করছে। তখন মা তাকে স্বান্তনা দিয়ে ঈদে আসার পর সব ঠিক হয়ে যাবে বলে, আর প্রচন্ড বৃষ্টি থাকাতে শব্দের কারণে ফোনে  বেশি কথাও তারা বলতে পারেনা। মেয়ে মাকে বলে বৃষ্টি গেলে পরে ফোন দেবে বলে জানায়। কিন্তু মেয়ের আর ফোন দেয়া হয়নি মাকে। মা মেয়ের আলাপের দুই ঘন্টা পর আরেকটি ফোন আসে মায়ের নাম্বারে। জানানো হয়, ‘আপনার মেয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।’ আজব হলেও সত্য, যে মেয়ে দু ঘন্টা আগে ফোনে তাকে হত্যা করা হবে বলে জানিয়েছে সেই মেয়ে দু ঘন্টা পর ফাঁসিতে ঝুলেছে? শরীরে গোসলের সময় তার খালা অনেক দাগ দেখেছে, যোনিপথে রক্ত বের হয়েছে প্রচুর বলেও জানিয়েছে। অবশেষে পোস্টমর্টেম করে লাশ দাফন হলেও এখন পর্যন্ত অভিযুক্তরা দাপটের সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

এখানে প্রশ্ন অনেক, পূর্বের নির্যাতন, সাবিনার মৃত্যুর দুই ঘন্টা আগে মায়ের কাছে ফোন এবং হত্যা করবে মর্মে আশংকামূলক বিবৃতি, যোনীপথে রক্তাক্ত অবস্থা ও শরিরে ক্ষত চিহ্ন। এসবকিছু কখনোই স্বাভাবিক আত্মহত্যাকে নির্দেশ করেনা। অথচ আমরা দেখছি পুলিশ প্রশাসন সন্দেহভাজন আসামীদের মুক্ত অবস্থায় রেখে এই মামলা ইনভেস্টিগেশন করছে। যাদের বিরুদ্ধে এতো অভিযোগ তাদের গ্রেফতার না করলে এই মামলা প্রভাবিত হবার সম্ভাবনা থেকে যায়। তাই যৌন নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীজোট সাধারণ জনতাকে সাথে নিয়ে কিছু দাবী উপস্থাপন করছে। আমরা আশা রাখবো, দ্রুততার সাথে আমাদের ন্যায্য দাবী পূরণ হবে।

১। সাবিনা ইয়াসমিনের মৃত্যুর ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার আসামীদের আগামী ৭২ ঘন্টার মধ্যে গ্রেফতার করে আইনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
২। মামলা প্রভাবিত হবার আশংকা যেনো ভিক্টিমের পরিবারের না থাকে তার জন্য পুলিশ প্রশাসনকে ভিক্টিমের প্রতি সহায়তামূলক ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে।
৩। সাবিনার মায়ের বক্তব্য আমলে নিয়ে পুলিশ প্রশাসনের কার্যকরী ভূমিকায় এগিয়ে আসতে হবে।

সংগ্রামী এক নারী হলেন সাবিনার মা। সাবিনা যখন কোলের শিশু তখনি তার বাবা মারা যায়। তারপর থেকে মা একাই জীবনযুদ্ধে নামেন মেয়েকে নিয়ে। মা মানুষের বাড়ি কাজ করে মেয়েকে এসএসসি পাশ করান, তারপর বিয়ে দেন একই থানায়। স্বামী মারা যাবার পর মেয়েকে নিয়ে প্রতিবার ঈদ করা মায়ের এবার আর ঈদ হলোনা আগের মতো। যে আশা ও স্বপ্ন নিয়ে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিলেন সব শেষ করে দিয়ে ঈদের তিনদিন আগে মেয়ে সাবিনা লাশ হয়ে ফিরেছে স্বামীর বাড়ি থেকে। আমরা আশা রাখবো, আর কোন মা’কে যেনো সন্তানের লাশ এভাবে দেখতে না হয়। আমরা অপরাধীদের গ্রেফতারের মাধ্যমে সর্বোচ্চ সাজা দেখতে চাই।

আমরা আশা রাখছি, আমাদের দাবীসমূহের প্রতি যথাযথ দৃষ্টি দিয়ে খুব শীঘ্রই এর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়ে নির্যাতনের শিকার পরিবারকে ন্যায়বিচার প্রদানে সহায়তা করবেন। নির্যাতিত মানুষের জয় হবেই- জয় বাংলা।

শিবলী হাসান,
আহবায়ক,
যৌন নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীজোট

আমাদের পরবর্তী কর্মসূচী-
১. আগামী৭ আগস্ট শুক্রবার বিকাল তিনটায় সাবিনার নিজ এলাকায় মানববন্ধন।
২. আগামী ৯ আগস্ট রবিবার উপজেলা চত্বরে গণ অবস্থান ও ইউএনও বরাবর স্মারকলিপি
৩৷ ১১ আগস্ট মংগলবার পরিবারের পক্ষ থেকে প্রেস কনফারেন্স ও ডিসি কার্যালয় বরাবর পরবর্তী কর্মসূচী ঘোষণা।

মতামত দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে