প্রিয় রাসেল স্বর্গের সুধা পান করে নিওঃ ফাতিমা পারভীন


আজ ১৫ আগস্ট কিন্তু ৭৫-এর ১৫ আগস্টের ভোরে সেই দিন কি ঘটেছিল এই সোনার বাংলায়! নিখুঁত করে নির্ধারিতভাবে লিখতে পারবোনা, শুধু এটুকু জানি গভীর শোকে কেঁদে উঠেছিল সেদিন থেকেই লাল সবুজের পতাকা।

পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যার পরে অচলায়তনের পাষাণ বেদীতে ক্ষত-বিক্ষত হতে থাকে আজকের বাংলাদেশ। 

১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর প্রিয় পরিবারের সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল শুধুমাত্র শেখ হাসিনা (মাননীয় প্রধানমন্ত্রী) ও শেখ রেহানা ব্যতিত সবাইকে।

১৫ আগস্ট থেকে বাংলার মানুষ কাঁদে। কাঁদে প্রকৃত দেশ প্রেমিকগণ, চোখ ঢেকে কাঁদে, আঁচলে মুখ লুকিয়ে কাঁদে,বুক ভেঙ্গে কাঁদে,গরীব দুঃখী মেহনতি জনতা কাঁদে, মানবতা কাঁদে,১৫ আগস্টের বেদনায় পরাজিত পৃথিবী কাঁদে। এই কান্নার আওয়াজ নেই, আছে নীরবতা। 


বঙ্গবন্ধুকে আমি দেখিনি কিংবা আমি দেখিনি মহান মুক্তিযুদ্ধ, কিন্তু আমি একাধিকবার বঙ্গবন্ধুর বাড়ি দেখেছি। ওই বাড়িতে বঙ্গবন্ধুর সাধারণ থেকে অতি সাধারণ জীবনযাপন আমাকে অবাক করে দিয়েছে।

ওই বাড়িতে রাখা বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সকল শহিদদের দেয়ালে তৈলচিত্র মিনিটের পর মিনিট দাঁড়িয়ে দেখেছি। ওই বাড়ি থেকে বের হয়ে মনে হয়েছিল বেশ কিছুক্ষণ আমার দেহে প্রাণ ছিলনা।

তারপর প্রকৃতির ব্যস্ততা ওই সময়টুকু ভুলিয়ে দিলেও একজন নিষ্পাপ শিশুর ছবি হৃদয় থেকে মুছে ফেলতে পারিনি, কারণ আমি যে একটি নিষ্পাপ ফুলের কলি দেখে এসেছি বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে। যে কলিটি ফুটতে শুরু করার আগেই হায়েনাদের রাজত্বে মুখ থুবড়ে পড়েছে মর্ত্যের পৃথিবী থেকে।

অনুভবে যে ওই ছোট্ট কলিটির কান্না দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনি হতে শুনেছি। বেঁকেচুরে এলিয়েপড়া নিথর দেহের শব্দ শুনেছি। তা মুছে ফেলতে পারছি না,শুধুই আমি নই,

খুনিদের আতঙ্কে পিপাসিত নিরাপদ আশ্রয়ে ঠাঁই চাওয়ার সেই আর্তনাদে শোকে কাঁদে ইতিহাসের সোনালী পাতা। হৃদয় ক্ষরণের ওই প্রতিধ্বনি লিখতে গেলে অশ্রু ঝরে ইতিহাসের বালুচরে,যা চোখের জলে মুছে যাবার নয়।

বলছি একজন শিশুর মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হওয়া শেখ রাসেল এর কথা।শেখ রাসেল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকা অঞ্চলের ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধু ভবনে ১৮ অক্টোবর, ১৯৬৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন।

পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সে সর্বকনিষ্ঠ। ভাই-বোনের মধ্যে অন্যরা হলেন বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর অন্যতম সংগঠক শেখ কামাল,

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা শেখ জামাল এবং শেখ রেহানা। শেখ রাসেল ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল ও কলেজের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র ছিলেন।জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে মাত্র এক ঘণ্টার অপারেশনে নৃশংসভাবে হত্যা করে পাষণ্ড ঘাতকরা।

ওই অল্প সময়েই খুন করে ১৮ জনকে। সেই বর্বরোচিত হত্যাকান্ডে ঘাতকদের হাত থেকে রেহাই পায়নি শিশু শেখ রাসেল, শিশু বাবু, এমনকি অস্তঃসত্ত্বা বধূও। ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট সন্ধ্যা থেকে ১৫ আগস্ট ভোর ৬টা পর্যন্ত কীভাবে সেই হত্যাযজ্ঞ ঘটে, সেই মর্মস্পর্শী মর্মান্তিক ঘটনা,

আড়ালে লুকিয়ে থাকে বছরের পর বছর কিন্তু মহান আল্লাহ নিরপেক্ষ পাপকে কোনো না কোনো ভাবে নিদর্শন হিসেবে রেখে দেয় তিনি, শুধু সময়ের অপেক্ষা।

তারপরও ওই জঘন্য হত্যাকারী ঘাতক মাজেদ, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় জনপ্রশাসনে সহকারী সচিব পদে চাকুরী পায় কুচক্রী মহলের কাছে, আমাদের কষ্ট সেখানেই। দীর্ঘ বছর পর কুখ্যাত খুনি মাজেদের ফাঁসির মধ্য দিয়ে বলতে পারছি পাপ বাপকেও ছাড়ে না!

জাতি হিসেবে আরেকটু দায়মুক্তি পেল, কিছুটা হলেও বাংলাদেশ কলঙ্কমুক্ত হল। একজন ভয়ঙ্কর অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার মধ্য দিয়ে জাতি কিছুটা হলেও লজ্জার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে কিন্তু মানবিকতার হৃদয়বৃত্তি থেকে একজন শিশুর সবটুকু মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় কিছুতেই সমাপিকা ঘটতে পারে না।

একজন শিশু রাসেলের হত্যাকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি তাৎক্ষণিক না দিয়ে বরং উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা হয়ে বাংলাদেশের জনপ্রশাসনে হাল ধরেন ঘাতক মাজেদ তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের

সহযোগিতায় সেই লজ্জা থেকে যাবে শতাব্দী থেকে শতাব্দী। ১৯৭৫ সালের সেনা অভ্যুত্থানে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার সময় মাজেদ নিজেই গুলি করেছিল শেখ রাসেলকে।  

ওইসময় শেখ রাসেলকে হাত ধরে ঘাতক মাজেদ নিয়ে যায়,সেদিন আতঙ্কিত হয়ে শিশু রাসেল কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেছিলেন, “আমি মায়ের কাছে যাব,পানি খাব”।

এর আগে ওই বাড়িতে সবাই বন্দি হয়ে পড়ে তাই মহিতুল ও রমাদের সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল ছোট্ট শিশু শেখ রাসেল। অসহায় হয়ে প্রথমে রমাকে ও পরে মহিতুল ইসলামকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, ‘ভাইয়া, আমাকে মারবে না তো?

কোনো জবাব নেই রমার মুখে। মহিতুল বলেন, ‘না ভাইয়া, তোমাকে মারবে না একথা শুনে শিশুটি তার মায়ের কাছে যেতে চায়। এরপরই ঘাতক মাজেদ দোতলায় নিয়ে যায় তাঁকে।

যেখানে বেগম মুজিবের নিথর দেহটি ঘরের দরজায় পড়ে থাকে। বাঁ-দিকে পড়ে থাকে শেখ জামালের মৃতদেহ। রোজী জামালের মুখে গুলি লাগে। আর রক্তক্ষরণে বিবর্ণ হয়ে পড়া সুলতানা কামালের মুখ দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে ছোট্ট শিশু রাসেল।

একটি শিশু চোখের সামনে মায়ের লাশ , বাবার লাশ, ভাইয়ের লাশ দেখছে। মায়ের মতো ভাবীদের রক্তাক্ত লাশ এরকম একটা অবস্থায় শেখ রাসেলের মানসিক অবস্থা কি হতে পারে? সারা বাড়ি জুড়ে রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত লাশ প্রিয় মা, বাবা,

ভাইকে দেখে ভয়ার্ত নিষ্পাপ শিশু শেখ রাসেল ক্যাপ্টেন মাজেদের হাত ধরে, লাশ দেখার পর অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে মিনতি করেছিলেন শেখ রাসেল “আমি হাসু আপার (শেখ হাসিনা) কাছে যাব।

সেদিন শেখ রাসেলের মায়াভরা কান্না গলাতে পারেনি পাষণ্ড মাজেদের মন,মৃত্যুর কাছে পৌঁছে দিলো ঘাতক মাজেদ। গুলি করে হত্যা করে শেখ রাসেলকে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়,চিরতরে থেমে যায় শেখ রাসেলের আতঙ্ক,

ঘুমিয়ে পড়ে চির পরিচিত নিজের আপনজনদের কাছে, হয়তো কোনোদিন ঘুম থেকে জেগে উঠে দেখবেনা যেখানে হাসু আপুর মমতার স্পর্শ লেগে ছিল, তাঁর মাথার সেই আহ্লাদের পেছনের অংশ চিরতরে থেঁতলে গিয়েছিল গুলিবিদ্ধ হয়ে,

পানির বদলে রক্তের বন্যা হয়েছিল তার চারপাশে, নিথর রক্তমাখা একরত্তি দেহটি পড়েছিল সুলতানা কামালের লাশের পাশে। সেদিন পানির বদলে শিশু রাসেলের ছোট্ট বুকের তাজা রক্তে লাল হয়েছিলো ৩২ নম্বর বাড়ির সমস্ত মেঝে,

মহান স্বাধীনতার সমস্ত বাংলা। সেদিন পিপাসিত রাসেলের রক্তে রঞ্জিত নিথর কণ্ঠনালীও রাঙা হয়েছিল, রক্তে ভিজেছিল তার মুখমন্ডল কিন্ত মিটাতে পারেনি তার শত আতঙ্কের পানির তৃষ্ণা। 

আজ ১৫ আগস্ট খুব জানতে ইচ্ছে করছে ঘাতক মাজেদের অন্তিম মুহুর্তে ফাঁসির কাষ্ঠে দাঁড়িয়ে এক মুহুর্তের জন্যও কি অনুশোচনায় দগ্ধ হয়েছিলো ওই পাষাণ হৃদয়টা?

মনে পড়েছিল শিশু রাসেলের করুন আহাজারি? আজ অহোরাত্র আর্তনাদে বলতে ইচ্ছে করছে,প্রিয় রাসেল তোমার ঘাতকদের বিরুদ্ধে আইনের সুশাসন প্রতিষ্ঠা হয়েছে।

ঘাতক মাজেদের ১১ এপ্রিল ফাঁসি কার্যকর হয়েছে, প্রাণের চেয়ে প্রিয়জনদের রক্তাক্ত লাশ দেখে আতঙ্কিত হয়ে পানির পিপাসা মিটাতে পারোনি,

আর্তচিৎকার করে পানি চেয়েছিলে, কুলাঙ্গার হায়নারা সেই পানি থেকে বঞ্চিত করেছে। যতবার ওই পানিতে পিপাসা মিটাই ঠিক ততবার মনে পড়ে যায় তোমার পিপাসিত র্আতচিৎকার।

মাজেদের ফাঁসিতে খুব খুশি খুব আনন্দিত আমরা,একটু করে হলেও হাসতে পেরেছে পুরো বাংলাদেশ এবার স্বর্গের সুধা পান করে নিও প্রিয় শেখ রাসেল।

লেখকঃ ফাতিমা পারভীন

লেখক শিশু ও নারী অধিকার কর্মী

fatimaparvin2013@gmail.com

মতামত দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে