বয়ঃসন্ধির আবেগাপ্লুত, জীবন হলো ধংসস্তুপ

নীল আর হলুদ মলাটের ডায়েরি খুলে পড়া শুরু করল বিন্তি ও শ্রাবণ। বিন্তি বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান,নবম শ্রেনিতে পড়ছে। অন্যদিকে শ্রাবণ দুই বোনের একমাত্র ভাই,সবে মাত্র কলেজে পা দিয়েছে।শ্রাবণ সকাল বেলা চা হাতে জনাব আকাশ আহমেদ এর পুরনো জীর্নশীর্ন নীল মলাটের ডায়েরিটা নিয়ে বসল আকাশ সমান কৌতুহল নিয়ে। এদিকে বিন্তিও সকালের নাস্তা সেরে মিসেস আফরোজা শীলার ময়লার আস্তর পরা হলুদ মলাটের ডায়েরিটা খুলে বসল।
সময়টা ২০০১। আকাশ ও শীলার প্রথম দেখা স্যারের বাসায় পড়তে গিয়ে। শীলা প্রথম দিকে কারো সাথে কথা না বললেও পড়ার ছলে আকাশ তার সাথে প্রতিদিনই দু’চারটে কথা বলার চেষ্টা চালিয়ে যেত। এভাবে দু’চারটে কথা বলা থেকে নোট আদান-প্রদান আর তা থেকে বন্ধুত্ব। বন্ধুত্ব থেকে একে অপরের প্রতি ভালবাসা। সে এক নিবিড় প্রেম যেন তাদের মধ্যে। একজন অন্যজনকে না দেখে, কথা না বলে থাকাটা দিনকে দিন তাদের জন্য দুস্কর হয়ে উঠেছিল। এভাবে নোট আদান-প্রদানের ভাঁজে চলত তাদের প্রেম নিবেদনের আলাপও। এইচএসসি ১ম বর্ষে ভালো ফলাফল করে দুজনেই এইচএসসির জন্য তৈরি করছিল নিজেদের। তবে,কাল হলো শীলার ম্যাথ নোটের ভাজে থাকা আকাশের ভালবাসার চিঠি। শীলার মায়ের হাতে এই চিঠি পড়তেই মেয়েকে অনেক মারধর করেন এমন কাজের জন্য। সারাদিন ধরে চলে তার মায়ের কটু কথা। রাতে শীলার বাবা ঘরে ফিরেই সব জানতে পেরে অগ্নিমূর্তির রুপ নেয়। বাবার এমন রুপ সে আগে কখনোই দেখেনি। রাগে গজগজ করতে করতে মেয়ের গালে কষিয়ে দুইটা চড় বসিয়ে দিয়ে জানিয়ে দেয় শীলার বাড়ির বাইরে যাওয়া বন্ধ। কলেজ-কোচিং সব বন্ধ করে দেন। এদিকে শীলাকে দেখতে না পেয়ে দিনের পর দিন অস্থির হয়ে উঠেছিল আকাশ। একদিন শীলার এক বান্ধবী স্বর্ণাকে দিয়ে আকাশ চিঠি পাঠায় শীলার কাছে। শীলা জানায় সেও ভালো নেই আকাশকে ছাড়া। এই চিঠি পড়ে আরো অস্থির হয়ে পড়ে আকাশ। আকাশের এই অবস্থা দেখে তার বন্ধুরা তাকে বলে, “দোস্ত, এখন পরীক্ষার দিকে একটু ফোকাস কর। পরীক্ষার পর তোরা এসব নিয়ে ভাবিস না।এখন ভাবলে দুজনেরই পরীক্ষা খারাপ হবে।” আকাশের মনে হল আসলেই তো। আমরা যদি ভালো ফলাফল না করি তাহলে আমরা একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে পারবনা। আর সুন্দর ভবিষ্যত না হলে যে শীলাকে এ জীবনে পাব না। আকাশ সিদ্ধান্ত নিল স্বর্ণাকে দিয়ে আবার চিঠি পাঠাবে আর বলবে যেন সে পড়ালেখায় মনোযোগ দেয়। শীলা আকাশকে অসম্ভব ভালবাসত। আর সেই ভালবাসা থেকেই হয়তো সেদিন আকাশের কথায় রাজি হয়ে পড়ালেখাই মনোযোগ দেয়। ভালোভাবেই দুজনে পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছিল। মাঝেমধ্যে স্বর্ণার মাধ্যমে চিঠির আদান-প্রদান হত।তবে, স্বর্নার এত এত ঘন ঘন শীলার কাছে আসা শীলার মায়ের কাছে খুব সন্দেহজনক মনে হওয়াই তিনি একদিন স্বর্নাকে শুনিয়ে শুনিয়ে শিলাকে বলেন, “সামনে পরীক্ষা,তোর আর স্বর্নার কিসের এত আড্ডা? কাল থেকে যেন না দেখি”। এই শুনে স্বর্না বুঝতে পারে শীলার বাসায় আসা যাবে না আর। ধীরে ধীরে এইচএসসি ঘনিয়ে এল। দু’জনে আলাদা কলেজে হলেও সৌভাগ্যক্রমে পরীক্ষা কেন্দ্রে দেখা হয় আকাশ-শীলার। পরীক্ষা শেষে প্রতিদিন তাই দুজনে কলেজের ভেতর দেখা করে বাসায় ফিরত।মাঝে মাঝে চিঠিতে কথা হত। শেষ পরীক্ষার দিন যত ঘনিয়ে আসছিল আকাশ-শীলার মনে আবার সেই অস্থিরতা কাজ করছিল। পরীক্ষা শেষে আবার কবে দেখা হবে, কিভাবে দেখা হবে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছিল পরীক্ষার চেয়ে পরীক্ষা শেষে আবার কবে দেখা হবে এটার চিন্তা বেশি কাজ করছিল।ভাবতে ভাবতে শেষ পরীক্ষার দিন পরীক্ষা শেষ করে দুজনের যেন কথায় শেষ হচ্ছে না।এদিকে পরীক্ষা শেষ হয়েছে প্রায় ৩৫মিনিট। শীলার কোনো দেখা না পেয়ে শীলাকে খুঁজতে তার মা অস্থির হয়ে কলেজের ভেতর চলে আসে আর আকাশের সাথে দেখতে পেয়ে সেখানেই মেয়েকে চড় মেরে টানতে টানতে বাসায় নিয়ে আসে আর আকাশকেও কয়েকটা কড়া কথা শুনিয়ে দেয়।যেগুলো আজও শীলার কানে বাজছে। যতদিন যাচ্ছিল আকাশ-শীলার অস্থিরতা আকাশ সমান হয়ে উঠছিল। একদিন আকাশ শীলাকে চিঠি লেখে শীলার বান্ধবীকে দিয়ে পাঠায়। আকাশ বলে, “আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না,শীলা। তুমি আমার কাছে চলে এস। আমি আর এভাবে থাকতে পারছি না”। আকাশের সেদিনের এই আবেগী চিঠি পেয়ে শীলা নিজের আবেগকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। একটাবারও নিজের বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে চিন্তা করেনি। আর আবেগকে প্রশ্রয় দিয়েই করে বসে জীবনের প্রথম ভুল। শীলা বাড়ি থেকে পালিয়ে যায় আকাশের কাছে, আর আকাশও শীলার চিঠি পেয়ে দু’বার ভাবেনি। দুজন আবেগের বসে বিয়ে করে ঘরে জানালে দুই পরিবারই রাগে বাসায় ফিরতে না করে দেই। অভিভাবকহীন,চাকরিহীন,বাসস্থানহীন এই জীবন যেন এক সাহারা মরুভূমিতে পরিনত হল। যেখানে আকাশ-শীলার বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির প্রস্তুতি নেওয়ার কথা সেখানে তারা জীবিকার সন্ধান করতে থাকে হন্যে হয়ে।মাত্র এইচএসসি দেওয়া আকাশ-শীলাকে কেই বা কাজ দিবে? শেষমেষ আকাশের বন্ধু তন্ময়ের সাহায্যে দুজনেই টিউশন জোগাড় করে একচালা টিনের ঘরে সংসার পাতে।শীলার চোখে তখন এক সুন্দর সংসারের স্বপ্ন আর আকাশ এই কঠিন বাস্তবতায় নিজেকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টায় বিভোর।শীলার বান্ধবী স্বর্না যেখানে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে ভাবছে,পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত; শীলা সেখানে এক জীর্ন একচালা টিনের ঘরে সংসার সামলাতে ব্যস্ত। যে শীলার চোখ কখনো কাজল ছাড়া থাকে না সেই শীলার পুরো মুখটাই দিনের পর দিন মলিন হয়ে যাচ্ছিল। আকাশ বললেই কলেজের যে স্মার্ট ছেলেটার কথা সবার আগে মাথায় আসত, সেই আকাশের সাথে যেন স্নার্টনেসের এক বিশাল দূরত্ব সৃষ্টি। মাঝে বেশ কয়েকবার তারা দুজনেই পরিবারের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে।কিন্তু,প্রতিবারই ব্যর্থ হয়। বছর দুয়েক পর আকাশ একটা ভালো চাকরি পেয়ে ঢাকায় যায় শীলাকে রেখে। ঢাকায় সবকিছু গুছিয়ে নিয়েই শীলাকে নিয়ে যাবে বলে কথা দেয় আকাশ। শীলাও অনেকদিন পর একটা স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনের ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়ে খুব খুশি হয় আর খুশিমনে আকাশকে বিদায় জানায়। কিন্তু,মানবমন! কবে যে কি হয়ে যায় কেউই টের পায়না।আকাশ দশ মাসে চাকরিতে ভালোই সুনাম অর্জন করে। তন্মধ্যে আকাশের দেখার দৃষ্টি বদলায়,মনমানসিকতা বদলায়।অফিসের এক মেয়ে কলিগের প্রেমে পড়ে আবারও আবেগকে প্রশ্রয় দিয়ে শীলার খোঁজ নেওয়া বন্ধ করে দেই। বিয়ে করে সংসার পাতে ঢাকায় আর শীলাকে বেমালুম ভুলে যায়।
আজ ১লা জুলাই,২০১৯। শীলা বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে একা বাঁচতে শিখে গেছে। অন্যদিকে,আকাশ তার অফিসের ঐ কলিগকে বিয়ে করে পরিবারের কাছে ফিরলে আকাশের আগের বিয়ের কথা শুনে সেই কলিগ তাকে ছেড়ে চলে যায়।বিষন্নতা আর নিজের ভুলের মাশুল গুনতে গুনতে দিনপার করছে আকাশ আর শীলা।অথচ,অন্যদিকে আকাশের বন্ধু তন্ময় যে কিনা টিউশন জোগাড় করে দিয়েছিল সে আজ হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রফেসর। আর শীলার বান্ধবী স্বর্না স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখে সংসার করছে সাথে একটা মাধ্যমিক স্কুলে শিক্ষকতায় আছে। জীবনের একটা সিদ্ধান্ত আজ এদের বর্তমান পরিস্থিতির কারণ।

বিন্তি শীলার পাশের বাসায় থাকে। প্রতিদিন শীলা আন্টি থেকে বই নিয়ে পড়ে।আর তাই শীলার বুকশেলফ থেকে সে নিজের ইচ্ছা মত বই নেওয়ার অধিকার থেকেই গতকাল এই হলুদ মলাটের ডায়েরিটা পেয়ে বাসায় নিয়ে আসে। অন্যদিকে,শ্রাবণ পুরোনো বই খাতা কিনতে আসা রহিম চাচার ঝুঁড়িতে নীল মলাটের এই ডায়েরি দেখে কৌতুহল জাগায় কিনে নিয়েছিল।

দীর্ঘশ্বাসের সাথে বিন্তি আর শ্রাবণ ডায়েরি বন্ধ করে ভাবে কিছুদিন আগে এমন অস্থিরতা বেশ কয়েকবার অনুভব করেছিল, ভেবেছিল সব ছেড়ে দিয়ে চলে যায়। কিন্তু এখন বুঝতে পারছে এই বয়সের আবেগকে প্রশ্রয় দিলে,আজীবনের জন্য নিজের বিবেকের কাছে হেরে যেত। জীবন হয়ে উঠত ধ্বংসস্তুপ যেমনটা হয়েছে আকাশ-নীলার জীবনে।
কিছুদিন আগে কলেজের সেই পুরোনো রাস্তা দিয়ে আসার সময় শীলা আর আকাশের দেখা হয়ে যায়।দুজনেই নির্বাক স্রোতা হয়ে তাকিয়ে রই। আর হয়ত ভাবে,
জীবনটা আরেকটু সুন্দর করে সাজানো যেত…….

মতামত দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে