জলবায়ু পরিবর্তনে স্থানান্তরিত ঢাকা শহরের দরিদ্র প্রবীণ নারীর বাস্তবিক সন্ধিক্ষণ

লেখক: কারিশমা আমজাদ। কলাম লেখক, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও পি এইচ ডি ফেলো, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

বিংশ শতাব্দীতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ব্যাপক উন্নতি, সচেতনতা, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন মৃত্যুহার যেমন কমিয়েছে, তেমনি বেড়েছে মানুষের গড় আয়ু। ফলে বয়স্কদের সংখ্যা বিশ্বসমাজে ক্রমেই বাড়ছে। জাতীয় পর্যায়ে জনসংখ্যার বার্ধক্য হলো বাংলাদেশের সবচেয়ে উদ্বেগজনক ও বিস্ফোরণোন্মুখ অবস্থা। অথচ বহুকাল ধরে আমরা এ বিষয়ে খুবই অসচেতন, উদাসীন ও নিষ্ক্রিয়।

এশিয়ার একটি ক্ষুদ্রতম দেশ বাংলাদেশ। যার মোট জনসংখ্যার একটি ক্ষুদ্রতম অংশ শতকরা ৬ ভাগ প্রবীণ। বাংলাদেশের প্রথম লোকগণনা রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৯৭৪ সালে এ দেশের ষাটোর্ধ্ব প্রবীণের সংখ্যা ছিল ৪০ লাখ ৫৬ হাজার ৯৫৮। এই সংখ্যা ধীরে ধীরে বেড়ে ১৯৯১ সালের লোকগণনায় ৬০ লাখ ৪৫ হাজার ২৩ জনে পৌঁছায়। প্রবীণদের এই সংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৫.৪২ শতাংশ ছিল।

২০১১ সালের লোকগণনায় প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দাঁড়ায় এক কোটিতে, যা মোট জনসংখ্যার ৭ শতাংশ; আর বর্তমানে এ সংখ্যা প্রায় এক কোটি ২০ লাখ। প্রাপ্ত উপাত্ত থেকে বলা যায় ২০১৫ সালে এই সংখ্যা ছিল ১ কোটি ২০ লক্ষ ৫০ হাজার। জাতিসংঘের সর্বশেষ বিশ্ব জনসংখ্যা প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, দেশের প্রবীণদের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বেড়ে ২০২৫ সালে হবে ১৭.৬২ মিলিয়ন (মোট জনসংখ্যার ১১ শতাংশ) এবং ২০৫০ সালে ৪৩.০২ মিলিয়ন, যা মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ হবে বলে মনে করা হয়।

বার্ধক্য একটি স্বাভাবিক জৈবিক ঘটনা এবং মন্থর ও আনুক্রমিক গতিতে এগিয়ে আসা দৈহিক অবক্ষয়। যার ফলে বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে কর্ম ক্ষমতা ও প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়। এটি অবসম্ভাবি জৈবিক বাস্তবতা। এর একটি নির্দিষ্ট গতি রয়েছে এবং বিভিন্ন প্রতিরোধ আবিস্কার সত্তেও তা মানুষের নিয়ন্ত্রনের বাইরে। কত বয়স অতিক্রম হলে একজন মানুষকে প্রবীণ বলে বিবেচনা করা হবে তার কোন বাধাধরা নিয়ম নেই।

এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অবসর গ্রহনের গড় বয়স, বিদ্যমান আইন, স্বাস্থ্যগত অবস্থা ইত্যাদি বিবেচনায় রেখে ৬০ বছর বয়সকে বার্ধক্যর পরিসংখ্যান সম্মত বাস্তব সীমা বলে মনে করা যায় এবং উন্নত অঞ্চলের জন্য ৬৫ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সীদের প্রবীণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

প্রবীণরা অতীতে নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবন যাপন করতেন আমাদের দেশের ঐতিহ্যবাহী যৌথ পরিবার ব্যবস্থায়। পরিবার পরিচালনায় মুখ্য ভূমিকা পালন করতেন মূলত প্রবীনরাই। আজকে যৌথ পরিবার ব্যবস্থা ভেঙে একক পরিবারে রূপ নিচ্ছে বিভিন্ন কারনে যেমন গণদারিদ্র্য, ভূমিহীনতা, পারিবারিক ও সামাজিক

আদর্শ ও মূল্যবোধের পরিবর্তন, যুব শ্রেণির গ্রাম থেকে শহরে স্থানান্তর, শিল্পায়ন ও নগরায়ণ, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, বস্তুতান্ত্রিক চিন্তাচেতনা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধ ইত্যাদি কারণে। আর এই পরিবর্তনশীলতার নীরব শিকার হচ্ছে প্রবীণ জনগোষ্ঠী। ধারনা করা হয়, প্রতিবছর ৩ লক্ষ থেকে ৪ লক্ষ মানুষ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নুতুন ভাবে স্থানান্তরিত হয়।

যার মধ্যে ৫ হাজারেরও বেশি লোক বস্তিতে জীবন অতিবাহিত করে। বন্যা, ক্ষরা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদি জলবায়ু পরিবর্তন দূর্যোগ হেতু স্থানান্তরিত হত দরিদ্র মানুষ তুলনামূক উন্নত জীবন যাপনের আশায় বস্তিতে বসবাস শুরু করে। এশিয়ার একটি দেশ হিসেবে প্রবীণদের দেখাশোনার ব্যপারে বাংলাদেশের সুদীর্ঘ সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্য রয়েছে এবং প্রত্যাশা থাকে যে পরিবার ও সমাজ তাদের প্রবীণ সদস্যদের যত্ন নিবে।

কিন্তু দ্রুত অতিসামাজিক ও জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন, ব্যাপক দারিদ্র, সহিষ্ণু, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ, পশ্চিমা সংস্কৃতিক প্রভাব এবং অন্যান্য কারনে ঐতিহ্যববাহী যৌথ পারিবারিক ও সামাজিক দেখাশোনার পদ্ধতি ভেঙে পড়েছে। এর মধ্যে প্রবীণ নারী জনগোষ্ঠী জলবায়ু পরিবর্তন জনিত দূর্যোগ ও স্থানান্তরে সব থেকে বেশি সমস্যার শিকার।

শহরে দরিদ্র প্রবীণ চরম দারিদ্র ও স্বাস্থ্যহীনতায় আক্রান্ত এবং মৌলিক মানবিক সমস্যার শিকার হচ্ছে। এ সবের মধ্যে রয়েছে অপর্যাপ্ত আর্থিক সংস্থান, পুষ্ঠিহীনতা সেবা ও চিকিৎসা সুবিধার অভাব, একাকিত্ব ও অবহেলা, বঞ্চণা এবং আর্তসামাজিক নিরাপত্তাহীনতা। দুঃখজনক হলেও সত্য যে দারিদ্র্য ও নির্ভরশীলতার অন্যতম শিকার হচ্ছে প্রবীণ জনগোষ্ঠী।

দরিদ্র পরিবারভুক্ত প্রবীণরা নিরুপায় হয়ে ভরণ-পোষণের তাগিদে কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ, এমনকি ভিক্ষাবৃত্তির মতো মানবেতর কাজেও জড়িয়ে পড়েন, যা অমানবিক। অনেক পরিবারেই সন্তানরা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নিয়ে থাকে, ফলে চিকিৎসাসহ বহু মৌলিক সেবা থেকে প্রবীণরা বঞ্চিত হন। অধিকাংশ প্রবীণ পারিবারিক ও সামাজিকভাবে উপেক্ষিত, অবহেলা, বঞ্চনা, নিরাপত্তাহীনতা ইত্যাদির শিকার হয়ে সমাজের বাড়তি বোঝা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।

বেশিভাগ প্রবীণ নারী তেমন কোন নিয়মিত আয়ের উৎস নেই। এর ফলে তারা খাদ্য, বস্ত্র, আশ্রয় এবং স্বাস্থ্য সেবার জন্য ব্যপকভাবে অন্যের উপর নির্ভরশীল। উল্লেখ করা যায় যে, এই শ্রেনীর মানুষ সাধারনত বড় ধরনের মানসিক ও সামাজিক সমস্যার ব্যাপারে কোন অভিযোগ করে না বরং তারা অতিপ্রাকৃতিক শক্তি, ধর্মের উপর পুরপুরি নির্ভরশীল থাকে।

জলবায়ু পরিবর্তনে স্থানান্তরের কারন দর্শাতে গেলে দেখা যায় যে, প্রবীণ নারীদের মধ্যে শতকরা ৩০ ভাগই সাইক্লোন অথবা মঙ্গা সময়ে কোন কৃষি সম্পর্কীয় কাজের অভাবেই চলে আছে। ২০ শতাংশ নারী চলে আসছে নদী ভাঙ্গোনে সর্বশান্ত হয়ে। দূর্যোগে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েই যে মানুষ স্থানান্তরে পথ বেছে নিচ্ছে কিংবা সহায়সম্বল ভিটামাটি ছেড়ে চলে আসছে তা কিন্ত নয় ভেতরের চিত্রটায় দেখা যায় যে,

তারা তাদের এলাকাতেই যথাসম্ভব চেষ্টা করে বেঁচে থাকার জন্য পক্ষান্তরে ঋন গ্রহন করতেই থাকে। একটা পর্যায়ে সেই ঋন এতটাই বাড়ে যা পরিশোধ করা তাদের সাধ্যের বাইরে চলে আসে। এমতোবস্থায় তাদের স্থানান্তর বাদে অন্য কোন উপায় অবশিষ্ট থাকে না। শতকরা ৬০ ভাগ জলবায়ু পরবর্তনে স্থানান্তরিত দরিদ্র প্রবীণ নারী তাদের পরিবারের সাথেই স্থানান্তরিত হয়ে আসে।

এর মধ্যে শতকরা মাত্র ১০ ভাগ জলবায়ু পরিবর্তনে স্থানান্তরিত দরিদ্র প্রবীণ নারী একাই বসবাস করে অথবা তাদের পরিচিত কোন ব্যক্তির সাথে বসবাস করছে। তথ্য অনুসন্ধানে দেখা যায়, শতকরা ৭০ ভাগ জলবায়ু পরবর্তনে স্থানান্তরিত দরিদ্র প্রবীণ নারী কাজ করতে পারে না তাদের বার্ধক্য জনিত স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারনে।

অন্যদিকে এরদের মধ্যে থেকেই ৩০ ভাগ জলবায়ু পরবর্তনে স্থানান্তরিত দরিদ্র প্রবীণ নারী বর্তমানে বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে নূন্যতম উপার্জন করতে পারছে। ৫৩ শতাংশ অর্থাৎ সবথেকে বড় অংশ জলবায়ু পরিবর্তনে স্থানান্তরিত দরিদ্র প্রবীণ নারী গৃহকর্মী হিসেবে নিজেকে নিয়োজিত করলেও অনান্য প্রবীণ নারীরা ময়লা আবর্জনা হতে কাগজ অথবা প্লাস্টিকের বতোল সংগ্রহ করা,

শাকসবজী বিক্রি অথাবা ভিক্ষার মাধ্যমে নিয়োজিত আছে। যে সকল প্রবীণ নারী কর্মক্ষম তাদের মধ্যে শতকরা ৬৭ ভাগ নারীই প্রতিমাসে ৪০০০ হতে ৬০০০ টাকা উপার্জন করতে সক্ষম হয়। যেখানে একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী মাসে প্রায় ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত উপার্যন করে থাকে। একটি মেসবাড়িতে রান্নার কাজ করতে গেলে জনপ্রতি যেখানে ১০০০টাকা পেয়ে থাকে ঠিক তেমনি একজন প্রবীণ নারী ঠিক সেই পর্যায়ের কাজ একটি মেসবাড়িতে ৪ জনের রান্নার কাজ করে মাত্র ২০০০/১০০০ টাকা পায়।

শারিরীক স্বাস্থ্যগত অবস্থার কারনে প্রবীণ নারীরা এর অতিরিক্ত কাজ করতেও পারে না। আজকের এই বাজার উর্দ্ধমুখী গতির সাথে এই স্বল্প উপার্জন দিয়ে দিনাতিপাত করতে তাদের হিমসীম খেতে হচ্ছে। অন্যদিকে যেসকল প্রবীণ নারীগন উপার্জনক্ষম তাদের শতকরা ৮৩ ভাগই পরিবার পরিজন সন্তান সন্ততি অথবা নাতি নাতনির কাছ থেকে অর্থ সহয়তায় জীবন যাপন করছে।

আর মাত্র ৫ শতাংশ প্রবীণ নারী স্থানান্তর হয়েও সরকারী ভাবে বয়স্কভাতার সুবিধায় আওয়াতাভুক্ত। তবে এই অর্থ প্রাপ্তির চিত্রও খুব বেশী সুবিধার নয়। মাত্র ৫০০ টাকা করে প্রতিমাসে তাদের জন্য বরাদ্দ হলেও তিনমাস অন্তর ১৫০০ টাকা করে তারা এই বয়স্ক ভাতা পেয়ে থাকেন। ব্যয়ের হিসেব কসতে গেলে দেখা যায় ঔষধ হল তাদের মুল খচের ক্ষেত্র।

এদের মধ্যে যে সকল প্রবীণ নারীর ব্যক্তিগত ভাবে একাকী জ়ীবন যাপন করেন তাদের আয়ের মূল অংশ ব্যয় হয় ঔষধ, খাদ্য, বাসাভাড়া ও অনান্য এই ক্রমানুসারে। ঔষধ বাবদ খরচ বেশী বিধায় এর পেছনের কারন অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রায় ৮৮ শতাংশ প্রবীণ নারী রিউমেটক ফিভার, মাথাব্যাথ্যা, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চরক্তচাপ ও বাত জনিত রোগের আক্রান্ত। কার কি রোগ তা চিহ্নিত হবার পরও তারা অর্থাভাবে কোন চিকিৎসায় ধারাবাহিক ভাবে অনুসরন করতে পারে না।

শেষ জীবনে প্রবীণরা নানা রোগ-ব্যাধির শিকার হন। স্বামীর মৃত্যু, সন্তানের অকালমৃত্যু, পরিবারের সদস্যদের অবজ্ঞা, প্রবীণের প্রতি তরুণসমাজের অনীহা ও উদাসীনতা, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, অপসংস্কৃতির প্রভাব ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে আধুনিক অসংগতিপূর্ণ জীবনধারার ক্রমবিকাশ, সামঞ্জস্যহীনতা, পরিবারে বিবাহযোগ্য সন্তান-সন্ততির উপস্থিতি ইত্যাদি কারণে অনেক প্রবীণ আবেগীয় ও মানসিক সমস্যা অনুভব করেন।

বাংলাদেশে প্রবীণদের হার যেমন বেড়ে চলেছে, তেমনি বেড়ে চলেছে তাঁদের বঞ্চনার পরিমাণ। শুধু সংখ্যায় তাঁরা দ্রুত বাড়ছে তা-ই নয়; তাঁদের অধিকারগত প্রয়োজন মেটানোর মতো পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রিক সমতা ক্রমেই গভীর সংকট ও তীব্র চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়ে পড়ছে। বার্ধক্য বাংলাদেশের জন্য এক ভয়াবহ সমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

লেখক: কারিশমা আমজাদ 

পি এইচ ডি ফেলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Email: sristy70@gmail.com

4 মন্তব্য

মতামত দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে