পানিবন্দি ও মৃতের সংখ্যা নিয়ে লুকোচুরি!

প্রতীকী ছবি। (সংগৃত)

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধিঃ ১৭. ০৭.২০২০

কুড়িগ্রামে প্রকৃত পানিবন্দি ও মৃতের সংখ্যা নিয়ে লুকোচুরি! পরপর দু’দফা বন্যায় নাজেহাল কুড়িগ্রামের নদ-নদী অববাহিকার অর্ধশতাধিক ইউনিয়নের চার শতাধিক গ্রামের কয়েক লাখ মানুষ। পানিবন্দি এসব ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধি ও উপজেলা প্রশাসনের হিসেবে জেলায় তিন লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি জীবন যাপন করলেও জেলা প্রশাসনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখার প্রতিবেদন অনুযায়ী পানিবন্দি লোক সংখ্যা দুই লক্ষেরও কম! সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন প্রতিবেদন সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলে বন্যার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র আড়াল রাখছে এবং বানভাসি ভুক্তভোগীরা সরকারের পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা থেকে বি ত থেকে যাচ্ছে। ফলে খাদ্য সংকটে থাকা সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়ে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে।

জেলা প্রশাসনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখার তথ্য অনুযায়ি জেলার ৯ উপজেলার ৫৬ টি ইউনিয়নের ৪শ’ ৭৫টি পরিবার পানিবন্দি হয়েছে। প্রতি পরিবারে ৪ জন সদস্য হিসেবে মোট ১ লাখ ৮৭ হাজার ৫৪০ জন মানুষ পানিবন্দি দেখানো হয়েছে। কিন্তু জেলার বন্যাকবলিত ইউনিয়নগুলোর বেশিরভাগই পুরোপুরি পানিবন্দি থাকলেও সেসব ইউনিয়নের প্রকৃত পানিবন্দির সংখ্যার সাথে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখার প্রতিবেদনের পানিবন্দি লোকের সংখ্যায় বিস্তর পার্থক্য পাওয়া গেছে।

এছাড়াও দ্বিতীয় দফা বন্যায় জেলার নাগেশ্বরী উপজেলায় ২ শিশু ও চিলমারী উপজেলায় এক মৃগী রোগী যুবক বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেলেও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখার প্রতিবেদনে বন্যায় মৃতের সংখ্যা শূন্য (০) দেখানো হয়েছে। অথচ সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের সূত্র অনুযায়ী দুই দফা বন্যায় জেলায় মৃতের সংখ্যা ১৩।

সদর উপজেলার যাত্রাপুর ও পাঁচগাছী ইউনিয়নসহ নাগেশ্বরী ড়ড় উপজেলার নারায়নপুর, উলিপুর উপজেলার সাহেবের আলগা, বেগমগঞ্জ, হাতিয়া, চিলমারী উপজেলার চিলমারী, নয়ারহাট, অষ্টমীচর, রৌমারী উপজেলার শৌলমারী, যাদুরচর, বন্দবেড় এবং রাজীবপুর উপজেলার তিনটি ইউনিয়নই নদীগর্ভে অবস্থিত। চরা ল হওয়ায় ছোট-বড় বন্যায় এসব ইউনিয়নের বাসিন্দারা পানিবন্দি হয়ে পড়েন। সংশ্লিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধিদের দাবি, এসব ইউনিয়নেই পানিবন্দি লোকের সংখ্যা দুই লক্ষাধিক। এরমধ্যে গত বুধবার (১৫ জুলাই) সন্ধ্যায় বন্যার পানির চাপে রৌমারী শহর রক্ষা বাঁধ ভেঙে শুধু ওই উপজেলাতেই প্রায় দুই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

রৌমারী উপজেলা চেয়ারম্যান শেখ আব্দুল্লাহসহ একাধিক ইউপি চেয়ারম্যান এমন তথ্য জানিয়েছেন। অথচ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখার হিসেবে পুরো জেলায় পানিবন্দি লোকের সংখ্যা দুই লাখের কম! শেখ আব্দুল্লাহ বলেন, ‘উপজেলায় পানিবন্দি পরিবারের তুলনায় ত্রাণ সহায়তা অত্যন্ত অপ্রতুল। অথচ বানভাসিদের জন্য শুকনো খাবার দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।’

উলিপুর উপজেলার সাহেবের আলগা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সিদ্দিক আলী মন্ডল জানিয়েছেন, তার ইউনিয়নের ৫ হাজারেরও বেশি পরিবারের প্রায় ২২ হাজার মানুষ পানিবন্দি জীবন যাপন করছেন। সেখানে সরকারি বরাদ্দৃত খাদ্য সহায়তা অপ্রতুল।

চিলমারী উপজেলার নয়ারহাট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবু হানিফা জানান, তার ইউনিয়নে ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি। অনেকে নিজ বাড়িতে পানিবন্দি অবস্থায় দিনানিপাত করলেও শুকনো খাবারের অভাবে খাদ্য কষ্টে ভুগছেন।

চেয়ারম্যান বলেন,‘ আমার ইউনিয়ন শতভাগ পানিবন্দি। এখানে ৬ হাজারেরও বেশি পরিবাররের সব ঘরবাড়িতে পানি। অনেক মানুষ ইউনিয়নের তিনটি আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিলেও তারা পানিবন্দি অবস্থায় শুকনো খাবারের জন্য হাহাকার করছেন। কিন্তু আমি এ পর্যন্ত মাত্র ১শ’ প্যাকেট শুকনো খাবার পেয়েছি।’ একই অভিযোগ ওই উপজেলার সম্পূর্ণ পানিবন্দি চিলমারী ও অষ্টমীচর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানগণের।

চিলমারী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শওকত আলী সরকার বলেন, ‘ আমার উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের প্রায় এক লাখ মানুষ পানিবন্দি। করোনাকালীন সময়ে কর্মহীন হয়ে পড়া এসব মানুষ বন্যায় পানিবন্দি হয়ে খাদ্যকষ্টে ভুগছে। এ অবস্থায় শুকনো খাবারসহ ত্রান সহায়তা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।’

জনপ্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্য মতে রৌমারী, চিলমারী ও  উলিপুর-শুধু এই তিন উপজেলায় পানিবন্দি লোকসংখ্যা আড়াই লাখেরও বেশি। এছাড়াও জেলার নাগেশ^রী, রাজারহাট ও সদরসহ ৬ উপজেলায় পানিবন্দি লোকের সংখ্যা দেড় লক্ষাধিক। কিন্তু জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা স্বাক্ষরিত বন্যা পরিস্থিতির প্রতিবেদনে পানিবন্দি লোকসংখ্যা মোট ১ লাখ ৮৭ হাজার ৫৪০ জন!

প্রকৃত পানিবন্দি মানুষের বিপরীতে ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার দেওয়া প্রতিবেদনে উল্লেখিত পানিবন্দি লোকসংখ্যা বন্যাকবলিত মানুষের সাথে ‘উপহাস’ করার শামিল উল্লেখ করে রেল-নৌ,যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটির সদস্য নাহিদ হাসান বলেন, ‘জেলা পর্যায়ের এই প্রতিবেদন সরকারের সংশ্লিষ্ট উচ্চ পর্যায়ে পাঠানো হয়। তার বিপরীতে বানভাসিদের জন্য সরকার  সহায়তা বরাদ্দ দিয়ে থাকে। জেলা থেকে যদি প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্থের প্রতিবেদন ত্রæটিপূর্ণ থাকে তাহলে সরকারের সদিচ্ছা থাকা সত্তে¡ও জনগণ তার সুফল ভোগ করতে পারে না। অথচ সরকারের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে কুড়িগ্রামের মানুষের জন্য একটা সফ্ট কর্নার রয়েছে। এজন্য আমরা দাবি করবো জেলা প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্থের প্রকৃত সংখ্যাটি সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলে তুলে ধরবেন এবং জেলার বানভাসিদের পর্যাপ্ত সহায়তার ব্যবস্থা নেবেন।’

জানতে চাইলে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আব্দুল হাই সরকার বলেন, ‘আমরা উপজেলা পর্যায় থেকে যে তথ্য পাচ্ছি তাই প্রতিবেদনে উল্লেখ করছি। পানিবন্দি লোকের সংখ্যা উল্লেখিত সংখ্যার চেয়ে বেশি হলে তথ্য সংশোধন করা হবে।’ আর বন্যার পানিতে মৃত্যুর বিষয়ে তাদের কাছে কোনও তথ্য নেই বলেও জানান তিনি।

প্রকৃত পানিবন্দি মানুষের চেয়ে কম সংখ্যা উল্লেখ করায় মানুষ ত্রাণ সহায়তা থেকে বি ত হচ্ছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে মানুষের ত্রাণ বি ত হওয়ার কথা স্বীকার করে এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসকের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন এই কর্মকর্তা।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন,‘ পানিবন্দি লোকের সংখ্যা উপজেলা পর্যায়ের প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ি উল্লেখ করা হয়। আর প্রতিবেদনে যে সংখ্যাই থাক পানিবন্দি কোনও মানুষের ত্রাণ সহায়তা থেকে বি ত হওয়ার সুযোগ নেই।’ সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিও এবং কমিউিনিটি লেভেলে বানভাসিদের ত্রাণ সহায়তা দেওয়া অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান জেলা প্রশাসক।

বন্যায় মৃত্যু ও মৃতের সংখ্যা উল্লেখ না করার বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন,‘ সিভিল সার্জনের সাথে কথা বলে এ বিষয়ে সমন্বয় করা হবে।’

মতামত দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে