প্রবাস জীবনের যাতনা !!!

প্রথম প্রথম এখানে এসে দেশের আত্মীয়স্বজন -বন্ধু -পরিচিত অনেককেই রেগুলার ফোন দেয়া হতো। একটা পর্যায়ে মানুষের কমন প্রশ্নে জর্জরিত হতে হতে দেশে যোগাযোগের পরিমাণ কমিয়ে দিতে হলো। প্রবাসের মানুষদের নিয়ে কিছু কমন কল্পকাহিনী মার্কেটে বেশ চলে, যেটা প্রবাসীরাই অনেক সময় রটায় –ধরা যাক আক্কাস ভাইকে ফোন দিলাম , একআধটু কুশল বিনিময়ের পরেই শুরু হবে ,” কি মিয়া বিদেশে বাড়িটাড়ি কিছু কিনলা নাকি ?” –কিঞ্চিৎ তব্দা খেয়ে উনাকে বুঝানোর চেষ্টা করি -ইয়ে মানে আমার প্রবাস জীবন মাত্র কয়েক বছরের ,তার উপরে এসেছি উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য নিয়ে। মোটামোটি এখনো স্ট্রাগলিং স্টেজেই আছি। কিন্তু উনি নাছোড়বান্দা –“আরে মিয়া ঐযে আমাদের মোখলেস চাচার পোলা খোখলেস আছে না ? ও তো ৩-৪ বছর হইলো গেছে তোমার সময়েই ,এখন ঐখানে আলিশান বাড়িটাড়ি কিনা এলাহী অবস্থা , দেশেও প্রতিমাসে লক্ষলক্ষ টাকা পাঠায়। শুনছি বিরাট রেস্টুরেন্ট ব্যবসা দিছে।

” -অথচ দেখা গেল আমি সেই খোখলেসকে এখানে ভালোমতই চিনি। তিনি এখানকার রেস্টুরেন্টের ওয়েটার।উনি এখানে বড় বাসাতেই থাকেন কিন্তু সেটা ভাড়া। ওয়েটার হোক আর হোটেলের মালিকই হোক সব কাজই সম্মানের আমি জানি , কিন্তু কেন এই ফাঁপড়ে বাংলাদেশ ? সেদিন এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের ফোন পেলাম , ” কি মিয়া তুমি যে পড়াশুনা করতে বিদেশে গেলা , তা কদ্দুর আগাইলা ? পিএইচডি শেষ করছো ?” –মিনমিনে গলায় বললাম , জ্বীনা এখনো না , কিন্তু দৌড় চলছে। দোয়া রাখবেন। ” –উত্তর এলো , ” আরে আমাদের কাশেম সাহেবের পোলা হাশেম গেলো ৪ বছর আগে, ও তো শুনলাম ঐখানে পিএইচডি কইরা এখন ঐখানেই একটা ভার্সিটিতে প্রফেসরও হয়ে গেছে। অস্ট্রেলিয়ান পাসপোর্টও পায়া গেছে।

“–দেখা গেলো দূর্ভাগ্যক্রমে আমি এই মেধাবী হাসেম সাহেবকেও চিনি , উনি এখনো পিএচডি করছেন , আর টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে আছেন , যতদূর জানি পাসপোর্টও হয়নি উনার। তাই গলায় মধু ঢেলে বললাম ,”আংকেল মানে হইছে কি উনি টিচিং এসিস্ট্যান্ট হিসেবে আছেন , প্রফেসর না !’–উনি গলায় ডাবল জোর এনে বললেন ,আরে মিয়া কি কও , ও তো বুয়েট থেকে পাস্ করছেনা ? ও এসিস্ট্যান্ট হইতে যাইবো কেন ?”- উনাকে আর বুঝানোর ব্যর্থ চেষ্টা করলাম না এই বলে যে বুয়েট -ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের দেশে সবাই চিনলেও উন্নত দেশগুলোতে আসলে এদের তেমন কেউ চিনেনা ভালো রেঙ্কিং এ না থাকার কারণে।

এবার আসা যাক দেশে বেড়াতে যাওয়া প্রবাসী ভাবীসমাজের গল্প , ” আর বলবেন না, বাংলাদেশ আসলে না- আমি একদম সিক হয়ে যাই , ইসসসস কি যে পলিউশন ,শুধু ফ্যামিলির টানে আসতে হয় , সেদিন পানি খেলাম এক গ্লাস সাথে সাথে আমার পেট খারাপ , কে যে একটা অবস্থা না ( ঠোঁটটা বেশ বাঁকানো থাকবে এই পর্যায়ে ) ,আর বাংলাদেশে তো দেখি ভালো কোনো ব্র্যান্ডও নেই। “–আরে ভাই জিন্দেগীভর খাইলি রাস্তার ফুচকা আর আচার –শপিং করলি গাউসিয়া ;শুক্কুর শুক্কুর ২ দিন হইলো বিদেশে থাকিস –আর এখন এক কাপ পানি খাইলেই তোর ‘আকাশ ভরা তারা ‘? এই পেট পাকানো রঙ্গিলা ঢঙিলা ভাবীসমাজের ম্যাক্সিমাম দেখা যায় বিদেশে কোনো সুপারশপে সকাল-বিকাল কামলা দিয়ে পেরেশান। চিটিং অ্যাসিস্ট্যান্ট হোক আর প্রফেসর হোক -রেস্টুরেন্ট হোক আর সুপারশপ হোক কোনো কাজেই অসম্মানের না –কিন্তু কেন এই ফাঁপড়ে বাংলাদেশ ! যাই হোক ,একটা প্রচলিত ধারণা আমাদের দেশে ভেসে বেড়ায় –বিদেশে যারাই থাকে তারাই সবাই সেই দেশের টপ লেভেলে জব করে , নিজের ২-৪ খানা বাড়ি আছে , আলিশান লাইফ। নিজের সামগ্ৰিক অবস্থার প্রকৃত চিত্র খুব কম মানুষই প্রবাস থেকে তার পরিচিত মহলে জানায় ! আবার প্রবাসী অন্য মানুষের সাথে এই প্রবাসীরা যখন আলাপ করে তখন আবার উল্টোটা।

উল্টোটা। ” ভাই বুঝলেন এই বিদেশে থাকি দেইখ্যা এমনে কামলা দিয়া চলতেছি , দেশে থাকতে এক গ্লাস পানিডাও ঢাইল্যা খাইতে হয়নাই , আমার বাপের যা সম্পত্তি ছিল ১০ পুরুষও বইসা শেষ করতে পারতোনা। ” মনে মনে ভাবি , ” যা না ভাই ,দেশে গিয়া তাহলে বাবার মুঘল সালতানাত দেখাশুনা করগে ,প্রবাসে কে তোকে এতো কষ্ট করে মাটি চিপকে থাকতে পা ধরে রেখেছে হে শাহজাদা ফাপড়কুমার ! দেশের মানুষের সাথে কথা বলার সময় মারিস এক ফাপড় আবার এখানকার মানুষের কাছে আরেক ফাপড় ! কেন তোদের এই ফাঁপড়ে বাংলাদেশ ,হে যুবক-যুবতী।

লেখকঃ ইয়াসির রশীদ, পিএইচডি অধ্যয়নরত (সিডনি, অস্ট্রেলিয়া)

মতামত দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে