বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতায় পরিবর্তনের ধারা

প্রতীকী ছবি।

আঠারো শতকে ইউরোপে আধুনিক ক্সবশিষ্ট্য নিয়ে সাংবাদিকতার সূচনা হয়। ১৭৮০ সালে কলকাতা থেকে হিকির গেজেট প্রকাশিত হওয়ার মধ্য দিয়ে এ উপমহাদেশে মুদ্রণ সাংবাদিকতার শুরু হলেও বাংলা সাংবাদিকতার যাত্রা শুরু হয় ১৮১৮ সালে বাঙ্গাল গেজেট, দিকদর্শন ও সমাচার দর্পন পত্রিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে। বিশ শতকের শুরুতে সাংবাদিকতা পেশার বিস্তৃতি ঘটে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগ এবং পূর্ববাংলার রাজধানী হিসেবে ঢাকার উত্থান সাংবাদিকতার বিস্তারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করে।

পরবর্তীতে নানা পথপরিক্রমায় পরিবর্তিত পরিস্থিতির আলোকে সময়ের চাহিদা পূরণে সাংবাদিকতার ছোট বৃক্ষটি নানা ডালপালা ছড়িয়ে মহীরুহ বটবৃক্ষে পরিণত হয়েছে। গণমাধ্যম হিসেবে সংবাদপত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে টেলিভিশন, বেতার ও চলচ্চিত্র। তথ্য প্রযুক্তির নতুন নতুন উদ্ভাবন গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতায় নতুন দিক উন্মোচন করেছে। হাল আমলের কম্পিউটার প্রযুক্তি ও ইন্টারনেট সাংবাদিকতায় ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে। বিগত দুই দশকে সাংবাদিকতার পরিবর্তন ঘটেছে ব্যাপকভাবে।

বিশেষতঃ মুদ্রণ ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমের ব্যাপক বিস্তারের ফলে গত দুই দশকে এর কলেবর, আধেয় ও ধরন-ধারণের মধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে। অন্যান্য পেশার মতো সাংবাদিকতাও এখন একটি পেশা হিসেবে স্বীকৃত। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে অন্য যেকোনো ব্যবসার মতো যে কেউ এ খাতে বিনিয়োগ করতে পারছে নির্দ্বিধায়। ফলে এখন আর শুধু আদর্শের ভিত্তিতে নয়, কর্পোরেট বাণিজ্যিক স্বার্থে এ পেশাকে ব্যবহার করা হচ্ছে। এখন কেউ আর আগের মতো সাংবাদিক হয়ে জন্মায় না, সাংবাদিকতা শিখতে হয় বাজার চাহিদার মত করে। সাংবাদিকতা এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। মূলধারার সাংবাদিকতাকে চ্যালেঞ্জ করে বিকল্প ধারার সাংবাদিকতার কথা বলা হচ্ছে। আলোচ্য নিবন্ধে সাংবাদিকতার এই পরিবর্তনের ধারার নানা দিক নিয়েই আলোচনার প্রয়াস।

আশির দশকের শেষভাগে ক্সস্বরাচারী শাসনের প্রতিবাদে মূলধারার সাংবাদিকতার বাইরে প্রতিবাদী সাংবাদিকতার একটি বিশেষ ধারা চালু হয়। এসময় বিচিন্তা, দেশবন্ধু, খবরের কাগজ, পূর্বাভাস, এই সময়, মানচিত্রসহ আরো বেশকিছু সাপ্তাহিক কাগজ বেরোয়। এগুলোর প্রচ্ছদ ছিল নিউজ প্রিন্টের। কার্টুন প্রচ্ছদ সম্বলিত এসব কাগজ এরশাদ সরকারের সমালোচনায় মুখর ছিল। ফলে সম্পাদকমন্ডলীসহ এগুলোর প্রকাশনা নানা বাধা বিপত্তির মুখে পড়ে। এরশাদ সরকারের পতনের পেছনে এসব কাগজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এরশাদের পতনের পর ম্যাগাজিন সাংবাদিকতার এ ধারাটি আর থাকেনি (বারী, ২০১০)। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে গণঅভ্যুত্থানে এরশাদ সরকারের পতনের পর বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে তত্তাবধায়ক সরকার বিশেষ ক্ষমতা আইনের ১৬, ১৭, এবং ১৮ নং ধারা অবলুপ্ত করলে সেন্সরশিপ ও প্রকাশনা নিষিদ্ধ সংক্রান্ত কালো আইনের বিলুপ্তি ঘটে। এ ছাড়া এ সময় প্রিন্টিং প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন অ্যাক্ট-এরও সংশোধনী আনা হয়।

১৯৯০ এর দশকে রেকর্ড সংখ্যক পত্র-পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আশির দশকে ক্সস্বরশাসন অবসানের পর ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে মোট পত্র-পত্রিকার সংখ্যা ছিল ৬৬৯টি কিন্তু পরের বছর তা বৃদ্ধি পেয়ে ৯৪০ এ উন্নীত হয় (আহমেদ, ২০০৩)। ১৯৯২ সালের পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশের মানুষের তথ্য পাওয়ার উৎস ছিল হাতেগোনা কয়েকটি পত্রিকা, বিবিসি রেডিও ও ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা সংবাদ। ১৯৯০ সালে বিরোধী গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে নতুন ভাষা, তথ্য বিন্যাস ও অবয়ব নিয়ে আজকের কাগজ প্রকাশিত হয় এক ঝাঁক তরুণ সাংবাদিকদের নিয়ে। এ পত্রিকার প্রথম পাতা ও শেষ পাতা ছিল প্রায় অভিন্ন। এই প্রথম পত্রিকায় প্রথম ও শেষ পাতায় পত্রিকার নেমপ্লেট ছাপার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। কাগজটির নতুন অবশিষ্ট্য ছিল যে সংবাদ যে পাতায় শুরু হতো সে পাতায় তা শেষ হতো। পত্রিকাটি নিজস্ব সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয়-এর বাইরেও পাঠকদের থেকে কিংবা সাংবাদিক/লেখক গন্ডির বাইরে চিন্তাশীল পাঠকদের কলাম লেখক হিসেবে পরিচিত করে তোলে। পরবর্তীতে প্রায় অধিকাংশ সংবাদপত্রই এ ধারাটি গ্রহণ করে।

এর প্রকাশ ভঙ্গিতে ক্সবচিত্র্য থাকলেও বিপনন ব্যবস্থা ছিল আগের সংবাদপত্রগুলোর মতোই। ১৯৯২ সালে অত্যাধুনিক স্যাটেলাইট ব্যবহার করে দেশের পাঁচটি স্থান থেকে একযোগে প্রকাশিত হয় জনকণ্ঠ। একসঙ্গে দেশের পাঁচ জায়গা থেকে প্রকাশিত হওয়ার কারণে দেশের সর্বপ্রান্তের মানুষের হাতে পেঁছে যায় এ পত্রিকাটি। ১৯৯৮ সালে ডেইলি ভোরের কাগজ ভেঙ্গে প্রথম আলো প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকা বাজারে আসার আগে প্রচারের ভিন্ন এক কে․শল বেছে নেয়। সম্পাদকের নেতৃত্বে কর্মীরা সারা দেশে জেলায় উপজেলায় মতবিনিময় সভার মাধ্যমে পাঠকদের নিয়ে ‘বন্ধুসভা’ নামে একটি সংগঠন ক্সতরি করে।

ফলে পত্রিকা বাজারে আসার আগেই পত্রিকার কর্মীরা দেশের প্রায় সব অঞ্চলের মানুষের মাঝে আগ্রহ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। প্রকাশের শুরু থেকেই ঝকঝকে ছাপা ও বর্ণাঢ্য ছবি ফিচার পাঠকদের আকৃষ্ট করে। ১৯৯৯ সালে একই কে․শল নিয়ে যুগান্তর বাজারে আসে। এরপর একে একে সমকাল, আমার দেশ, নয়াদিগন্তসহ অনেক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। শুরু হয় স্থানীয় পত্রিকাগুলোর মধ্যে পাঠক ধরে রাখার তীব্র প্রতিযোগিতা। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে রেজিস্ট্রিকৃত ৫৭৭টি পত্রিকা বের হচ্ছে, তন্মধ্যে ঢাকা থেকে ২৭৩টি, ঢাকার বাইরে ৩০৪টি (ডিএফপি, ২০০৭)। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ১৯৬৪ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশন যাত্রা করলেও স্যাটেলাইট টেলিভিশনের যাত্রা আরও অনেক পরে- ১৯৯২ সালে।

এ বছর বাংলাদেশ টেলিভিশন সিএনএন ও বিবিসির অনুষ্ঠান রিলে করে সম্প্রচার শুরু করে। সরকার ১৯৯৫ সালে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এসটিভিআর (স্যাটেলাইট টিভি রিসিভার) এর ক্সবধতা দিলে বিদেশি চ্যানেলগুলোর স¤প্রচার শুরু হয় (রহমান, ২০০৭)। ১৯৯৭ সালে এটিএন বাংলা প্রথম বেসরকারি স্যাটেলাইট টিভি হিসেবে সম্প্রচার শুরু করে। ১৯৯৯ সালে সম্প্রচার শুরু করে দ্বিতীয় বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল আই। দেশে বর্তমানে স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে যে ধারায় সংবাদ পরিবেশন করা হয় এর পথিকৃৎ একুশে টেলিভিশন।

২০০০ সালে দেশের প্রথম বেসরকারী টেরিস্ট্রিয়াল চ্যানেল হিসেবে একুশে টিভি খুব দ্রত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এর আগে পত্রিকার রিপোর্টাররা সংবাদের জন্য নানা জায়গায় ছুটে যেতেন। সংবাদকর্মীরা ক্যামেরা হাতে ঘটনাস্থলে ছুটতে থাকেন। আগে টেলিভিশন সরাসরি সম্প্রচার বলতে ফুটবল, ক্রিকেট ম্যাচ কিংবা জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল প্রচার ছাড়া আর কিছুই কল্পনা করা যেত না। একুশে টেলিভিশন সেই ধারণা ভেঙ্গে দেয়।

সংবাদ কতভাবে দেখানো যায় একুশে টিভি তা দর্শক সাধারণকে দেখিয়ে দেয়। ভোক্তা দর্শক সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশে টেলিভিশন চ্যানেলের সংখ্যা যেমন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে এই মাধ্যমে বিনিয়োগ। বিসিসিপি এবং অন্যান্য সংস্থার যে জরিপ ‘ন্যাশনাল মিডিয়া সার্ভে ২০০২’ এবং এসি নিলসেন এর ন্যাশনাল মিডিয়া এন্ড ডেমোগ্রাফিক সার্ভে ২০০৬ এর পরিসংখ্যান হতে দেখা যায়, ১৯৯৫ সালে যেখানে বাংলাদেশে টেলিভিশন ব্যবহারের হার ছিল ৩৬ শতাংশ সেখানে ২০০২ সালে শহরে এই হার ৮৩ শতাংশ, গ্রামে ৫০ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে।

২০০৬ সালে টেলিভিশন বাংলাদেশে অন্য যে কোন মিডিয়া, যেমন সংবাদপত্র, রেডিও, ম্যাগাজিন, চলচ্চিত্র ও ইন্টারনেটের তুলনায় সর্বোচ্চ প্রবেশযোগ্য মিডিয়া হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে টেলিভিশন ব্যবহারের হার অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ, ৬৫ শতাংশ (রহমান, ২০০৭)। বাংলাদেশে যেখানে ১৯৯৭ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত আট বছরে চ্যানেলের সংখ্যা ছিল পাঁচটি, সেখানে ২০০৫ সাল হতে ২০০৭ সালের ফেব্রয়ারী পর্যন্ত মাত্র দু’বছরে ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে যোগ হয় আরও ১২টি চ্যানেল। বর্তমানে দেশে একটি রাষ্ট্রীয় টেরিস্ট্রিয়াল ও স্যাটেলাই চ্যানেলসহ এক ডজনেরও বেশি বেসরকারি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের সম্প্রচার চলছে। ভ

আরো অর্ধ ডজনের মতো চ্যানেল সম্প্রচার অপেক্ষায় আছে। গণমাধ্যমের অন্যতম বাহন রেডিও যাত্রা শুরু করে ১৯৩৯ সালে অল ইন্ডিয়া রেডিও ঢাকা কেন্দ্র চালুর মধ্য দিয়ে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে অদ্যাবধি রেডিও ক্ষমতাসীন সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকায় শ্রোতাদের রুচি, বিশ্বাস ও মূল্যবোধের পরিবর্তনের কথা বিবেচনায় রেখে অনুষ্ঠানের মান বাড়ানোর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে মানুষ রেডিও বিমুখ হয়ে পড়ে। সরকারি গণমাধ্যম বাংলাদেশ রেডিও-এর এই ক্রান্তিলগ্নে ১৯৯৯ সালের ২৬ মার্চে দেশের প্রথম প্রাইভেট রেডিও রেডিও মেট্রোওয়েভ এর সম্প্রচার চালু হয়।

বাংলাদেশ বেতারের টাইম স্পট ভাড়া করে প্রতিদিন ৬ ঘন্টার অনুষ্ঠান প্রচার করতো এ চ্যানেলটি। ২০০৩ সালে নানা অনিয়মের অভিযোগে সরকার এটি বন্ধ করে দেয়। বস্তুতঃ বেসরকারি মালিকানায় বেতারের সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা না থাকায় অল্পদিনের মধ্যেই দেশের প্রথম বেসরকারী রেডিও চ্যানেলটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ২০০৫ সালের ১৫ অক্টোবর থেকে বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রচার শুরু করে এফএম রেডিও টুডে। এ বছরেই রেডিও আমার এর সম্প্রপচার শুরু হয়। বর্তমানে ৫টি এফএম রেডিও চ্যানেলের সম্প্রচার চলছে।

আরো আসছে………

১। ইন্টারনেটের আবির্ভাব ও অনলাইন সাংবাদিকতা

২। স্যাটেলাইট টেলিভিশনের আবির্ভাব

৩। এফএম রেডিও’র আবির্ভাব

৪। গণমাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রে পরিবর্তন

তথ্যসূত্রঃ

জুনায়েদ আহমদ হালিম

সহযোগী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,

 জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

মুহাম্মদ আনওয়ারুস সালাম

প্রভাষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

মতামত দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে